ফিফা ফান্ডিংয়ের 'ভূতুড়ে প্রকল্প': মাঠের ঘাস শুকায়, ফাইলে ফোটে ফুল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফিফা ফান্ডিংয়ের 'ভূতুড়ে প্রকল্প': মাঠের ঘাস শুকায়, ফাইলে ফোটে ফুল

জাহিদ রিজভি  avatar   
জাহিদ রিজভি
ফিফা ফান্ডিংয়ের 'ভূতুড়ে প্রকল্প': মাঠের ঘাস শুকায়, ফাইলে ফোটে ফুল
ফিফা ফান্ডিংয়ের 'ভূতুড়ে প্রকল্প': মাঠের ঘাস শুকায়, ফাইলে ফোটে ফুল
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) কর্তৃক ফিফা ফরওয়ার্ড প্রোগ্রামের আওতায় গৃহীত একাধিক তৃণমূল ফুটবল উন্নয়ন প্রকল্পের অডিট রিপোর্ট...

সম্প্রতি, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) কর্তৃক ফিফা ফরওয়ার্ড প্রোগ্রামের আওতায় গৃহীত একাধিক তৃণমূল ফুটবল উন্নয়ন প্রকল্পের অডিট রিপোর্টে গুরুতর অসঙ্গতি উঠে এসেছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কিছু জেলায় ফুটবল মাঠের উন্নয়ন, সরঞ্জাম সরবরাহ ও কোচিং কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হয়নি। বিশেষত, যে মাঠগুলোতে ঘাস লাগানোর কথা ছিল, সেখানে শুকনো মাটি ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়েনি, অথচ প্রকল্পের নথিপত্রে ব্যয়ভার সম্পূর্ণ দেখানো হয়েছে। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে ফিফা ফান্ডিংয়ের অপব্যবহারের এক জঘন্য চিত্রকে পুনরায় উন্মোচন করেছে, যেখানে মাঠের বাস্তব অবস্থা এবং দাপ্তরিক নথিপত্রের মধ্যে বিস্তর ফারাক বিদ্যমান।

এই ধরনের 'ভূতুড়ে প্রকল্প' বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। ফিফা ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম, যা বিশ্বজুড়ে ফুটবলের অবকাঠামো এবং তৃণমূল পর্যায়কে শক্তিশালী করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্যই এখানে ব্যাহত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯-২০২১ চক্রে ফিফা থেকে প্রাপ্ত প্রায় $৬ মিলিয়ন ডলারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডিএফএ) এবং ক্লাবগুলোকে অনুদান হিসেবে দেখানো হলেও, মাঠ পর্যায়ে এর কার্যকারিতা নগণ্য। অনেক জেলায় খেলার উপযোগী মাঠের অভাব প্রকট, তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য সঠিক প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত, এবং স্থানীয় লিগগুলো নিয়মিত আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে না। এই অর্থ যদি সঠিকভাবে ব্যয় হতো, তবে বাংলাদেশের ফুটবল র্যাংকিং এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের পারফরম্যান্সে ইতিবাচক পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক ছিল, যা বর্তমানে অনুপস্থিত। বরং, এই তহবিলগুলো কাগজে-কলমে 'ফুল ফোটানো'র কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত দুর্নীতির একটি চক্র তৈরি করছে এবং প্রকৃত উন্নয়নের পথ রুদ্ধ করছে।

এই আর্থিক অনিয়মের সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের ফুটবল ইকোসিস্টেমের উপর। যখন ফিফা বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন World Bank অথবা ADB (যদিও এডিবি সরাসরি ফুটবল ফান্ডিংয়ে কম জড়িত, তবে ক্রীড়া অবকাঠামোতে তাদের আগ্রহ থাকতে পারে) থেকে আসা অনুদান বা ঋণ স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছায় না, তখন তৃণমূলের খেলোয়াড়রা বঞ্চিত হয়। তারা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলস্বরূপ, প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের একটি বড় অংশ হারিয়ে যায় এবং জাতীয় দলে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানসম্পন্ন খেলোয়াড় তৈরি হয় না। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে ক্রীড়া পরিদপ্তর এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তত্ত্বাবধানের অভাবও এই অব্যবস্থাপনার জন্য অনেকাংশে দায়ী। সরকারি অডিট বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যদি এই প্রকল্পগুলোর নিয়মিত ও নিবিড় অডিট পরিচালনা না করে, তবে এই ধরনের 'ভূতুড়ে প্রকল্প' চলতেই থাকবে এবং বাংলাদেশের ফুটবল তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হবে।

বছর ফিফা ফরওয়ার্ড ফান্ডিং (মিলিয়ন USD) তৃণমূল প্রকল্পের সংখ্যা (আনুমানিক) অডিট রিপোর্টে অসঙ্গতিপূর্ণ প্রকল্পের শতাংশ জাতীয় দলের ফিফা র্যাংকিং (বছরের শেষে)
২০১৭-২০১৮ ১.৭৫ ১২ ৩০% ১৯৩
২০১৯-২০২০ ১.৫ ১০ ৪০% ১৮৭
২০২১-২০২২ ২.০ ১৫ ৫০% ১৯২
২০২৩-২০২৪ (প্রক্ষেপিত) ২.৫ ১৮ ৬0% (প্রাথমিক অনুমান) ১৯৪

উৎস: ফিফা ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম রিপোর্ট, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের বার্ষিক প্রতিবেদন, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক অডিট রিপোর্ট, ফিফা র্যাংকিং ডেটা।

সুপারিশ

  • ফিফা ফরওয়ার্ড প্রোগ্রামের আওতায় গৃহীত সকল প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বাধীন 'প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন মনিটরিং ইউনিট' (PIMU) গঠন করা হোক, যা মাঠ পর্যায়ে প্রকল্পের অগ্রগতি ও তহবিল ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং প্রতি তিন মাস অন্তর বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে শক্তিশালী করে 'ক্রীড়া উন্নয়ন প্রকল্প যাচাই-বাছাই ও অনুমোদন নীতিমালা' (Sports Development Project Vetting & Approval Policy) প্রণয়ন করা হোক, যেখানে প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের পূর্বে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অবস্থা যাচাই এবং কাজ সমাপ্তির পর স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ দ্বারা গুণগত মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে।
  • দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক ফিফা ফান্ডিং সংক্রান্ত সকল প্রকল্প ব্যয়ের একটি বিশেষ অডিট পরিচালনা করা হোক এবং 'সরকারি অর্থ তছরুপ প্রতিরোধ আইন, ২০১৮' (Prevention of Misappropriation of Public Funds Act, 2018) এর আওতায় দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহিদ রিজভি

জাহিদ রিজভি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়ন ও ফিফা ফান্ডিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator