এআই ও ফ্যাক্ট-চেকিং: মিথ্যার গতি, সত্যের লড়াই | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এআই ও ফ্যাক্ট-চেকিং: মিথ্যার গতি, সত্যের লড়াই

তানজিনা ইয়াসমিন  avatar   
তানজিনা ইয়াসমিন
এআই ও ফ্যাক্ট-চেকিং: মিথ্যার গতি, সত্যের লড়াই
এআই ও ফ্যাক্ট-চেকিং: মিথ্যার গতি, সত্যের লড়াই
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ইউনেস্কোর 'গাইডলাইনস ফর রেগুলেটিং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মস: এ মাল্টি-স্টেকহোল্ডার অ্যাপ্রোচ' শীর্ষক প্রতিবেদনে কৃত্রিম বু...

সম্প্রতি, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ইউনেস্কোর 'গাইডলাইনস ফর রেগুলেটিং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মস: এ মাল্টি-স্টেকহোল্ডার অ্যাপ্রোচ' শীর্ষক প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ভুল তথ্য ও অপতথ্যের দ্রুত প্রসারের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জেনারেটিভ এআই মডেলগুলির দ্রুত উত্থান এবং ডিপফেক প্রযুক্তি সাধারণ জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর ক্ষমতাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে, যা তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, এআই-সৃষ্ট বিষয়বস্তু দ্বারা সৃষ্ট অস্থিরতা এখন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, যেখানে একটি ভুল তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে জনমতকে প্রভাবিত করছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি, বিশেষ করে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) এবং জেনারেটিভ অ্যাডভারসেরিয়াল নেটওয়ার্কস (GANs) এর মতো প্রযুক্তিগুলি, ভুয়া তথ্য এবং ডিপফেক তৈরির প্রক্রিয়াকে গণতান্ত্রিকীকরণ করেছে। পূর্বে উচ্চ কারিগরি জ্ঞান এবং ব্যয়বহুল সরঞ্জামের প্রয়োজন হলেও, এখন সাধারণ ব্যবহারকারীরাও তুলনামূলকভাবে কম খরচে বা বিনামূল্যে বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহার করে বাস্তবসম্মত অডিও, ভিডিও এবং টেক্সট তৈরি করতে সক্ষম। এই 'সিন্থেটিক মিডিয়া' এতটাই নিখুঁত হয় যে, একজন সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, এমনকি প্রশিক্ষিত চোখও অনেক সময় এর সত্যতা যাচাই করতে হিমশিম খায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি এআই মডেল একটি রাজনৈতিক নেতার কণ্ঠস্বর অনুকরণ করে এমন একটি বক্তব্য তৈরি করতে পারে যা তিনি কখনোই দেননি, অথবা একটি ভিডিওতে তার মুখমণ্ডল পরিবর্তন করে এমন অঙ্গভঙ্গি করানো যেতে পারে যা তার প্রকৃত আচরণের সম্পূর্ণ বিপরীত। এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ভুয়া খবরকে কেবল দ্রুত ছড়িয়ে দিতেই সাহায্য করছে না, বরং এর বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা সমাজে অবিশ্বাস ও মেরুকরণের জন্ম দিচ্ছে। এর ফলে তথ্যের উপর মানুষের আস্থা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে এবং ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে, যা গণতন্ত্র ও সুশীল সমাজের জন্য এক গভীর সংকট তৈরি করছে।

ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলির জন্য এআই-চালিত ভুয়া তথ্যের এই বিস্তৃতি এক নতুন মাত্রার চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ঐতিহ্যবাহী ফ্যাক্ট-চেকিং পদ্ধতি, যা মানব-নির্ভর বিশ্লেষণ এবং ম্যানুয়াল ক্রস-রেফারেন্সিং এর উপর নির্ভরশীল, তা এআই-এর দ্রুত গতির সাথে তাল মেলাতে পারছে না। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ নতুন ভুয়া খবর এবং ডিপফেক তৈরি হচ্ছে, যা যাচাই করার জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ ও সময় ফ্যাক্ট-চেকারদের নেই। উপরন্তু, এআই-সৃষ্ট ভুয়া তথ্যের উৎস খুঁজে বের করা অত্যন্ত কঠিন, কারণ এটি প্রায়শই বেনামী বা স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। World Bank এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবের কারণে এআই-সৃষ্ট ভুয়া তথ্য আরও দ্রুত ও সহজে ছড়িয়ে পড়ছে, যা সামাজিক সংহতি এবং জনস্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে, ফ্যাক্ট-চেকারদের এখন শুধু ভুয়া তথ্য শনাক্ত করলেই চলছে না, বরং তাদের এআই-ভিত্তিক টুল ব্যবহার করে ভুয়া তথ্যের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ, উৎস চিহ্নিতকরণ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর কৌশলও আয়ত্ত করতে হচ্ছে। এটি একটি নিরন্তর দৌড় যেখানে এআই-এর মিথ্যা তৈরির গতি প্রায়শই সত্য যাচাইয়ের গতিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা একটি 'ইনফোডেমিক' পরিস্থিতি তৈরি করছে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এআই-ভিত্তিক সমাধানগুলিই এখন আশার আলো দেখাচ্ছে। ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলি এখন এআই এবং মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ভুয়া খবর শনাক্তকরণ, ডিপফেক বিশ্লেষণ এবং তথ্যের উৎস যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করার চেষ্টা করছে। ব্লকচেইন প্রযুক্তির সাহায্যে ডিজিটাল কন্টেন্টের উৎস এবং পরিবর্তনের ইতিহাস ট্র্যাক করার জন্য 'কন্টেন্ট প্রোভেনেন্স' প্রোটোকল তৈরি করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০০৮ (সংশোধিত ২০২৩) এর অধীনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিতে ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচী গ্রহণ করছে। ADB (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) এর সহায়তায় বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রকল্পগুলিতে ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যা ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাগুলি সত্যের পক্ষে লড়াইকে আরও শক্তিশালী করছে, যেখানে এআই-এর মিথ্যা তৈরির ক্ষমতাকে এআই-এর মাধ্যমেই প্রতিহত করার চেষ্টা চলছে। তবে, এই প্রযুক্তিগুলির কার্যকারিতা এবং তাদের নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা একটি চলমান চ্যালেঞ্জ, যার জন্য প্রয়োজন নিরন্তর গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর উন্নয়ন।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এআই-সৃষ্ট ভুয়া তথ্যের প্রভাব (২০২৩)
সূচক ২০২২ ২০২৩ পরিবর্তনের হার (%)
এআই-সৃষ্ট ডিপফেক ভিডিওর সংখ্যা বৃদ্ধি ৪৫,০০০ ১,৫০,০০০+ ২৩৩%
এআই-সৃষ্ট ভুয়া খবর সনাক্তকরণে চ্যালেঞ্জ উচ্চ অত্যন্ত উচ্চ -
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া তথ্যের বিস্তারের হার (প্রথম ২ ঘন্টায়) ৭২% ৯৫% ৩১.৯৪%
ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার কর্মভার বৃদ্ধি ১২০% ১৭৫% ৪৫.৮৩%

উৎস: UNESCO, World Bank ও IFCN (International Fact-Checking Network) এর বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি 'জাতীয় এআই-ফ্যাক্ট-চেকিং সেন্টার' প্রতিষ্ঠা করুক, যা অত্যাধুনিক এআই টুলস ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য দ্রুত শনাক্ত করবে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০০৮ (সংশোধিত ২০২৩) এর ধারা অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
  • World Bank ও ADB এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় দেশব্যাপী একটি ডিজিটাল সাক্ষরতা ও মিডিয়া লিটারেসি প্রোগ্রাম চালু করা হোক, যা সকল স্তরের নাগরিককে এআই-সৃষ্ট ভুয়া তথ্য চিনতে এবং যাচাই করতে সক্ষম করে তুলবে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য।
  • সকল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে (যেমন ফেসবুক, ইউটিউব) বাধ্য করা হোক যাতে তারা এআই-সৃষ্ট বিষয়বস্তু স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার জন্য 'কন্টেন্ট প্রোভেনেন্স' প্রযুক্তি বা ওয়াটারমার্কিং সিস্টেম ব্যবহার করে এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এই নিয়মাবলী কঠোরভাবে প্রয়োগ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানজিনা ইয়াসমিন

তানজিনা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মিসইনফরমেশন ও ফ্যাক্ট-চেকিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator