প্রবাসে মেধাবীদের গবেষণা ও উদ্ভাবন: বাংলাদেশের ব্রেন ড্রেনের নীরব শক্তি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্রবাসে মেধাবীদের গবেষণা ও উদ্ভাবন: বাংলাদেশের ব্রেন ড্রেনের নীরব শক্তি

ড. জহিরুল ইসলাম  avatar   
ড. জহিরুল ইসলাম
প্রবাসে মেধাবীদের গবেষণা ও উদ্ভাবন: বাংলাদেশের ব্রেন ড্রেনের নীরব শক্তি
প্রবাসে মেধাবীদের গবেষণা ও উদ্ভাবন: বাংলাদেশের ব্রেন ড্রেনের নীরব শক্তি
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উন্নত গবেষণার সুযোগ এবং ভালো কর্মজীবনের সন্ধানে বিদেশে প...

সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উন্নত গবেষণার সুযোগ এবং ভালো কর্মজীবনের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এই প্রবণতা দীর্ঘদিনের হলেও, প্রতি বছর দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী প্রায় ৫ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশমুখী হচ্ছেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। যদিও প্রাথমিকভাবে এটিকে 'ব্রেন ড্রেন' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, কিন্তু প্রবাসে এসব মেধাবীর গবেষণা ও উদ্ভাবন বাংলাদেশের জন্য একটি নীরব শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যা সুনির্দিষ্ট নীতি ও সহায়তার মাধ্যমে কাজে লাগানো যেতে পারে।

প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশি মেধাবীরা শুধু আন্তর্জাতিক গবেষণা ক্ষেত্রকেই সমৃদ্ধ করছেন না, বরং বৈশ্বিক উদ্ভাবনেও রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি, রিনিউয়েবল এনার্জি এবং উন্নত ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্সের মতো অত্যাধুনিক ক্ষেত্রগুলোতে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করছেন। তাদের গবেষণাপত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে এবং তাদের উদ্ভাবনগুলো বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি ও শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। এই মেধা ও উদ্ভাবন যদি দেশের সাথে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা যায়, তাহলে তা বাংলাদেশের জ্ঞান-ভিত্তিক অর্থনীতি গঠনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। দুঃখজনক হলেও, এই বিশাল মেধা সম্পদের সাথে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগের কাঠামো এখনও দুর্বল।

এই নীরব শক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য একটি কার্যকর ইকোসিস্টেম তৈরি করা অপরিহার্য। বর্তমানে, দেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল এবং অত্যাধুনিক অবকাঠামোর অভাব প্রায়শই মেধাবীদের বিদেশে পাড়ি জমানোর অন্যতম কারণ। যদিও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, কিন্তু উচ্চতর গবেষণা ও উদ্ভাবনে প্রবাসীদের সাথে সংযোগ স্থাপনের সুনির্দিষ্ট কৌশল এখনো অনুপস্থিত। বিশেষ করে, উন্নত গবেষণাগার, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিবেশের অভাব দেশের মেধাবীদের বিদেশে কর্মসংস্থান খুঁজতে উৎসাহিত করে। এই অবস্থায়, প্রবাসে থাকা মেধাবীদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার জন্য উদ্ভাবনী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে তারা দূরবর্তী অবস্থান থেকে গবেষণা প্রকল্প, পরামর্শ প্রদান এবং জ্ঞান বিনিময়ে অংশ নিতে পারবেন। Skill for Employment Investment Program (SEIP) এর মতো প্রকল্পগুলো যদি শুধু দেশীয় প্রশিক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক জ্ঞান বিনিময়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও কাজ করতে পারে, তবে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

প্রবাসে বাংলাদেশি পেশাদারদের একটি বড় অংশ তাদের কর্মক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাদের এই বাস্তব অভিজ্ঞতা দেশের শিল্প, শিক্ষা এবং গবেষণা খাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ গবেষণা প্রকল্প, ভার্চুয়াল মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম বা অতিথি বক্তা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের অংশগ্রহণ দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈশ্বিক মানদণ্ড সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারে। Bangladesh Bureau of Educational Information and Statistics (BANBEIS) এর তথ্যানুসারে, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণায় ব্যয়িত অর্থ জিডিপির ০.১ শতাংশেরও কম, যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও, প্রবাসীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান ও উদ্ভাবন দেশের স্বল্প সম্পদের মধ্যেও গবেষণা ও উন্নয়নে গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২
উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা (আনুমানিক) ৪২,০০০ ৪৬,০০০ ৫০,০০০+
দেশের জিডিপিতে গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় (শতাংশ) ০.০৭% ০.০৮% ০.০৯%
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি সম্পন্নকারী (গড়ে) ৩৫০ ৩৭৫ ৪০০
বিশ্বের শীর্ষ ১% বিজ্ঞানীর মধ্যে বাংলাদেশি (সংখ্যা) ১৫০+ ১৭৫+ ২০০+

উৎস: UGC বার্ষিক প্রতিবেদন, বিশ্বব্যাংক, BANBEIS, Scopus ডেটাবেস বিশ্লেষণ।

সুপারিশ

  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এর অধীনে একটি 'প্রবাসী মেধা সংযোগ প্ল্যাটফর্ম' প্রতিষ্ঠা করা, যা প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশি গবেষক ও উদ্ভাবকদের একটি ডাটাবেস তৈরি করবে এবং দেশীয় শিল্প, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে তাদের যৌথ গবেষণা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
  • বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কর্তৃক আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুদান ও ফেলোশিপের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা, যেখানে প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে অংশীদারিত্বে গবেষণা প্রস্তাব জমা দিতে পারবেন, এবং এই তহবিলের আওতায় 'গবেষণা বিনিময় প্রোগ্রাম' (Research Exchange Program) চালু করা যা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর সহযোগিতায় পরিচালিত হবে।
  • Skill for Employment Investment Program (SEIP) এর আওতায় একটি 'ভার্চুয়াল মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম' চালু করা, যেখানে প্রবাসে কর্মরত অভিজ্ঞ পেশাদাররা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের দূরবর্তী অবস্থান থেকে মেন্টরশিপ প্রদান করবেন এবং শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবেন, যা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. জহিরুল ইসলাম

ড. জহিরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator