সম্প্রতি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ হেলথ বুলেটিনে ক্যান্সারের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং এর চিকিৎসায় নতুন প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তার উপর আলোকপাত করা হয়েছে। এই বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১.৫ লক্ষ নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হয় এবং এর মধ্যে প্রায় ১ লক্ষ রোগী মৃত্যুবরণ করে। এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসার (Personalized Cancer Treatment) অপরিহার্যতাকে তুলে ধরে, যেখানে জিনোমিক্স (Genomics) ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। যদিও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে জিনোমিক্স-ভিত্তিক ক্যান্সার চিকিৎসা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে এর সম্ভাবনা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (NIMH) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মানসিক স্বাস্থ্যের জিনোমিক্স গবেষণায় সীমিত পরিসরে কাজ শুরু করলেও, ক্যান্সার গবেষণায় এই প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার এখনও সুদূর পরাহত।
ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসায় জিনোমিক্স প্রযুক্তির প্রয়োগ মূলত রোগীর টিউমারের জিনোমিক প্রোফাইলিংয়ের উপর নির্ভরশীল। এর মাধ্যমে প্রতিটি রোগীর ক্যান্সারের জন্য দায়ী নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তনগুলো চিহ্নিত করা যায়, যা প্রচলিত কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশনের পরিবর্তে টার্গেটেড থেরাপি (Targeted Therapy) বা ইমিউনোথেরাপি (Immunotherapy) নির্বাচনের সুযোগ করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ব্রেস্ট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে HER2 জিন মিউটেশন শনাক্তকরণের মাধ্যমে ট্রাস্টুজুমাব (Trastuzumab) এর মতো টার্গেটেড ড্রাগ ব্যবহার করা হয়, যা রোগীর সুস্থ কোষের ক্ষতি না করে শুধুমাত্র ক্যান্সার কোষগুলোকে আক্রমণ করে। বাংলাদেশে, ইনস্টিটিউট অফ এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) সংক্রামক রোগের জিনোমিক নজরদারিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, ক্যান্সার জিনোমিক্সের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক ল্যাবরেটরি অবকাঠামো এবং দক্ষ জনবলের অভাব প্রকট। এর ফলে, অনেক রোগীই সঠিক জিনোমিক পরীক্ষা ও প্রোফাইলিংয়ের অভাবে প্রচলিত ও কম কার্যকর চিকিৎসা গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা কেবল রোগীর জীবনযাত্রার মানই নয়, চিকিৎসার সামগ্রিক ফলাফলকেও প্রভাবিত করছে। উপরন্তু, এই ধরনের উন্নত পরীক্ষার উচ্চ ব্যয়ভারও বাংলাদেশের সাধারণ রোগীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যেখানে অধিকাংশ স্বাস্থ্যসেবা এখনও সরকারি ভর্তুকি বা ব্যক্তিগত ব্যয়ের উপর নির্ভরশীল।
জিনোমিক্স-ভিত্তিক ক্যান্সার চিকিৎসার প্রসারে বায়োইনফরমেটিক্স (Bioinformatics) এবং ডেটা অ্যানালাইসিসের ক্ষমতাও অত্যাবশ্যক। জিনোমিক ডেটা বিশ্লেষণ করে রোগীর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। এর জন্য উন্নত কম্পিউটেশনাল টুলস এবং বিশেষজ্ঞ বায়োইনফরমেটিসিয়ানের প্রয়োজন, যা বাংলাদেশে এখনও অপ্রতুল। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) দেশের স্বাস্থ্য খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের উপর জোর দিলেও, জিনোমিক ডেটা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় প্ল্যাটফর্ম এখনও গড়ে ওঠেনি। এই ডেটা প্ল্যাটফর্মের অভাবে জিনোমিক গবেষণা ও ক্লিনিকাল প্রয়োগের মধ্যে সংযোগ স্থাপন কঠিন হয়ে পড়ছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) নতুন ঔষধ এবং চিকিৎসার অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করলেও, জিনোমিক্স-ভিত্তিক টার্গেটেড থেরাপির ঔষধগুলোর দ্রুত এবং সাশ্রয়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় এই ধরনের ঔষধগুলো বাংলাদেশে সহজে পাওয়া যায় না অথবা অত্যন্ত উচ্চ মূল্যে আমদানি করতে হয়, যা রোগীদের নাগালের বাইরে চলে যায়। জিনোমিক্স প্রযুক্তির পূর্ণ সদ্ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি স্থাপন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং ডেটা সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নৈতিক ও আইনি কাঠামো তৈরি করাও অপরিহার্য। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে না পারলে, ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসার সম্ভাবনা কেবল একটি স্বপ্নই থেকে যাবে।
| সূচক | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ | ২০২৩ (আনুমানিক) |
|---|---|---|---|---|
| নতুন ক্যান্সার রোগী (লক্ষ) | ১.৪ | ১.৪৫ | ১.৫ | ১.৫২ |
| ক্যান্সারজনিত মৃত্যু (লক্ষ) | ০.৯৫ | ০.৯৮ | ১.০ | ১.০২ |
| সরকারি হাসপাতালে জিনোমিক টেস্টিং সুবিধা (%) | ০ | ০ | ০.৫ | ১.০ |
| টার্গেটেড থেরাপি ঔষধের সহজলভ্যতা (%) | ১৫ | ১৭ | ২০ | ২২ |
উৎস: DGHS হেলথ বুলেটিন (২০২১-২০২৩), MOHFW বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২২-২০২৩) এবং IEDCR এর সাম্প্রতিক প্রকাশনা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সংকলিত।
সুপারিশ
- স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর অধীনে একটি জাতীয় জিনোমিক্স নীতি (National Genomics Policy) প্রণয়ন করা হোক, যা ক্যান্সার গবেষণায় জিনোমিক্স ল্যাবরেটরি স্থাপন, দক্ষ বায়োইনফরমেটিসিয়ান ও ক্লিনিকাল জেনেটিসিয়ান তৈরি এবং জিনোমিক ডেটা সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করবে।
- ইনস্টিটিউট অফ এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (NIMH) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক জিনোমিক সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি ও বায়োইনফরমেটিক্স টুলস দ্বারা সজ্জিত করে ক্যান্সার জিনোমিক প্রোফাইলিংয়ের জন্য আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক এবং এগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি (যেমন ISO 15189) অর্জনের ব্যবস্থা করা হোক।
- ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) যৌথভাবে একটি ফাস্ট-ট্র্যাক অনুমোদন প্রক্রিয়া (Fast-Track Approval Process) চালু করুক, যা জিনোমিক্স-ভিত্তিক ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহৃত টার্গেটেড থেরাপি ঔষধগুলোর দ্রুত আমদানি, রেজিস্ট্রেশন এবং সাশ্রয়ী মূল্যে সহজলভ্যতা নিশ্চিত করবে, প্রয়োজনে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের উৎসাহিত করার জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।