ইইউ'র জিএসপি প্লাস: স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ইইউ'র জিএসপি প্লাস: স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ

সাদিয়া আফরিন  avatar   
সাদিয়া আফরিন
ইইউ'র জিএসপি প্লাস: স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ
ইইউ'র জিএসপি প্লাস: স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ
ছবি: সংগৃহীত
২৭শে নভেম্বর, ২০২৩ তারিখে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ইইউ জয়েন্ট কমিশনের ৫১তম সভা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাইলফলক, যেখানে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তাল...

২৭শে নভেম্বর, ২০২৩ তারিখে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ইইউ জয়েন্ট কমিশনের ৫১তম সভা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাইলফলক, যেখানে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য সম্পর্ক এবং জিএসপি প্লাস সুবিধার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এই সভা বাংলাদেশের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সাথে তার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, বিশেষ করে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের পর ইইউ-এর বিদ্যমান অস্ত্র বাদে সব (EBA) সুবিধা হারানোর সম্ভাব্যতার প্রেক্ষাপটে।

বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি ঐতিহাসিক অর্জন হলেও, এটি ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের বর্তমান EBA সুবিধার অবসান ঘটাবে। EBA সুবিধা মূলত ইইউ-এর সাধারণীকৃত অগ্রাধিকারমূলক স্কিম (GSP) কাঠামোর অংশ, যা স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। ২০২৯ সাল পর্যন্ত EBA সুবিধার বর্ধিত মেয়াদ থাকলেও, এরপর বাংলাদেশকে জিএসপি প্লাস স্কিমের আওতায় আসতে হলে কঠোর মানবাধিকার, শ্রম অধিকার, পরিবেশ এবং সুশাসন সংক্রান্ত ২৭টি আন্তর্জাতিক কনভেনশন সম্পূর্ণরূপে মেনে চলতে হবে। এই কনভেনশনগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) মৌলিক কনভেনশন, এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইইউ-এর সাথে এই ট্রানজিশন পিরিয়ড নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছে, যেখানে জিএসপি প্লাসের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া এবং প্রাসঙ্গিক শর্তাবলী পূরণের রোডম্যাপ তৈরি হচ্ছে। ইইউ-এর পররাষ্ট্র বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি জোসেফ বোরেল সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করলেও, শ্রম অধিকার এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার উন্নতির ওপর জোর দিয়েছেন, যা জিএসপি প্লাস পাওয়ার ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

জিএসপি প্লাস সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো বহুমুখী এবং গভীর। প্রথমত, শ্রম অধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলো, বিশেষ করে আইএলও কনভেনশন ৮৭ (সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা) এবং ৯৮ (সংগঠিত ও সম্মিলিত দর কষাকষির অধিকার) সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখাতে হবে। সম্প্রতি, তৈরি পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শ্রম আইনের সংশোধন এবং তার বাস্তবায়ন ইইউ-এর পর্যবেক্ষণে রয়েছে। দ্বিতীয়ত, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার উন্নতিও ইইউ-এর মূল বিবেচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে একটি। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জিএসপি প্লাস স্ট্যাটাস অর্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এসব ক্ষেত্রে যেকোনো ঘাটতি ইইউ-এর পক্ষ থেকে কঠোর পর্যালোচনার কারণ হতে পারে। উপরন্তু, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ, বিশেষ করে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং টেকসই উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণ করাও একটি চ্যালেঞ্জ, যা বাংলাদেশের শিল্প খাতকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে বাধ্য করবে। BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর সাথে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইইউ-এর আগ্রহের বিষয়, যা পরোক্ষভাবে জিএসপি প্লাস প্রাপ্তির আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের এবং সফল অংশগ্রহণ বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় দেশটির প্রতিশ্রুতির পরিচায়ক, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে তোলে এবং ইইউ-এর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

সূচক ২০২২ সালের অবস্থা ২০২৯ সালের সম্ভাব্য প্রভাব জিএসপি প্লাস শর্তাবলী পূরণের চ্যালেঞ্জ
ইইউ-তে রপ্তানির পরিমাণ (বিলিয়ন ইউএসডি) ২৫.৫ (২০২২-২৩ অর্থবছর) ১৫-২০% শুল্ক বৃদ্ধি (আনুমানিক ৫-৭ বিলিয়ন ইউএসডি ক্ষতি) শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে উন্নত শ্রম ও মানবাধিকার মানদণ্ড
জিএসপি প্লাস-এর জন্য প্রয়োজনীয় কনভেনশনের সংখ্যা ২৭টি সম্পূর্ণ পরিপালন না হলে সুবিধা হারানো আইএলও কনভেনশন ৮৭, ৯৮ এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত সনদ বাস্তবায়ন
এলডিসি থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত বছর ২০২৬ EBA সুবিধার অবসান (২০২৯ পর্যন্ত বর্ধিত) জিএসপি প্লাস আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা
ইইউ-এর বিশ্ব বাজারে জিএসপি প্লাস প্রাপ্ত দেশ ৯টি (যেমন: পাকিস্তান, ফিলিপাইন) প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ

উৎস: বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB), ইউরোপীয় কমিশন, ইউএনসিটিএডি (UNCTAD)।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর কনভেনশন ৮৭ (সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা) এবং ৯৮ (সংগঠিত ও সম্মিলিত দর কষাকষির অধিকার) সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়নের জন্য 'শ্রম আইন, ২০০৬' (সংশোধিত ২০২৩) এর আরও প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করতে হবে এবং এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও শ্রমিক ছাঁটাই সংক্রান্ত বিধিনিষেধ কার্যকর করে।
  • বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) জিএসপি প্লাস স্কিমের ২৭টি আন্তর্জাতিক কনভেনশনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার প্রদর্শনে একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা (Roadmap) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে মানবাধিকার, সুশাসন এবং পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও সময়সীমা উল্লেখ থাকবে, এবং নিয়মিতভাবে ইইউ-এর সাথে অগ্রগতি প্রতিবেদন বিনিময় করতে হবে।
  • বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ইইউ বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধার অধীনে রপ্তানি বহুমুখীকরণে একটি 'জাতীয় রপ্তানি কৌশল ২০৩০' প্রণয়ন করতে হবে, যা তৈরি পোশাকের বাইরে চামড়া, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইসিটি সেবা এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মতো উচ্চ-মূল্যের পণ্য রপ্তানিতে জোর দেবে এবং এই খাতগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানোন্নয়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যাতে জিএসপি প্লাস প্রাপ্তির পর প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কাজে লাগানো যায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাদিয়া আফরিন

সাদিয়া আফরিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বৈশ্বিক নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator