জাহাজ ভাঙা শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিবেশ সুরক্ষায় গ্রিন ট্যাগ কতটা বাস্তব? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জাহাজ ভাঙা শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিবেশ সুরক্ষায় গ্রিন ট্যাগ কতটা বাস্তব?

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
জাহাজ ভাঙা শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিবেশ সুরক্ষায় গ্রিন ট্যাগ কতটা বাস্তব?
জাহাজ ভাঙা শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিবেশ সুরক্ষায় গ্রিন ট্যাগ কতটা বাস্তব?
ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত এশিয়া পিয়ার্ড শিপব্রেকিং ইয়ার্ডকে গত বছর (২০২৩) বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'গ্রিন ইয়ার্ড' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। এই স্...

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত এশিয়া পিয়ার্ড শিপব্রেকিং ইয়ার্ডকে গত বছর (২০২৩) বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'গ্রিন ইয়ার্ড' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। এই স্বীকৃতি দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হলেও, এর কার্যকারিতা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় এর প্রকৃত অবদান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশেষত, যখন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই শিল্পের পরিবেশগত ও শ্রম নিরাপত্তা মান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী সহায়তা প্রদান করে আসছে, তখন 'গ্রিন ট্যাগ'-এর মতো উদ্যোগ কতটা বাস্তবসম্মত এবং তা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা কার্যকর, তা নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। দেশের অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান অনস্বীকার্য হলেও, পরিবেশ দূষণ এবং শ্রমিক নিরাপত্তার প্রশ্নগুলো বরাবরই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প, যা বিশ্বব্যাপী মোট জাহাজ ভাঙার প্রায় ৫০% পরিচালনা করে, প্রতি বছর প্রায় ২.৫ মিলিয়ন টন স্টিল রিকভারি করে থাকে, যা দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের এক বিশাল অংশ পূরণ করে। তবে, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সাথে যুক্ত রয়েছে বিপুল পরিমাণ বিপজ্জনক বর্জ্য, যার মধ্যে রয়েছে অ্যাসবেস্টস, পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইলস (PCBs), ভারী ধাতু, তেল ও তৈলাক্ত পদার্থ, এবং বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একাধিক নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যার মধ্যে 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনর্ব্যবহার বিধিমালা, ২০২২' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই বিধিমালায় বিপজ্জনক বর্জ্য পৃথকীকরণ, সংগ্রহ, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং পরিবেশসম্মত উপায়ে নিষ্পত্তির বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। তবে, শিল্প মালিকদের ব্যয়বহুল বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই বিধিমালাগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উদাহরণস্বরূপ, একটি জাহাজ ভাঙার সময় উৎপন্ন অ্যাসবেস্টস বর্জ্য সঠিকভাবে অপসারণ ও সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত ফ্যাসিলিটি প্রয়োজন, যা অধিকাংশ ইয়ার্ডে অনুপস্থিত। অনেক ক্ষেত্রে, এই বিপজ্জনক বর্জ্য খোলা স্থানে ফেলে রাখা হয় অথবা অপরিশোধিত অবস্থায় নদীতে বা খোলা মাটিতে ফেলা হয়, যা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।

'গ্রিন ট্যাগ' পাওয়ার শর্তাবলী এবং এর প্রয়োগ নিয়েও অনেক সময় স্বচ্ছতার অভাব দেখা যায়। World Bank এবং ADB-এর সহায়তায় পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পে ইয়ার্ডগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের উপর জোর দেওয়া হলেও, গ্রিন ট্যাগ প্রদান প্রক্রিয়ায় তৃতীয় পক্ষের স্বাধীন নিরীক্ষার অভাব প্রায়শই পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশ সরকার, পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ইয়ার্ডগুলোর পরিবেশগত মান পরিমাপের জন্য কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে, তবে এই মানদণ্ডগুলো আন্তর্জাতিক কনভেনশন, যেমন হংকং কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অফ শিপস (২০০৯)-এর সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। হংকং কনভেনশন, যা বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হলেও এখনো কার্যকর হয়নি, জাহাজ পুনর্ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে। এই কনভেনশন অনুযায়ী, প্রতিটি জাহাজকে অবশ্যই একটি 'HazMat Inventory' (Hazardous Materials Inventory) সহ ইয়ার্ডে প্রবেশ করতে হবে, যা বিপজ্জনক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য অপরিহার্য। অধিকাংশ বাংলাদেশী ইয়ার্ডে এই ধরনের ইনভেন্টরি যাচাই বা ব্যবহারের সক্ষমতা এখনো সীমিত। যদিও কিছু ইয়ার্ড আধুনিক স্লিপওয়ে পদ্ধতি এবং গ্যাস কাটিং-এর জন্য উন্নত যন্ত্রপাতি ব্যবহার শুরু করেছে, তবে বিপজ্জনক বর্জ্যের জন্য একটি কেন্দ্রীয় বা আঞ্চলিক প্রক্রিয়াকরণ ও নিষ্পত্তি কেন্দ্র গড়ে তোলা এখনো সম্ভব হয়নি, যা গ্রিন ট্যাগ-এর দীর্ঘমেয়াদী বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

সূচক ২০১৩ ২০১৮ ২০২২
বার্ষিক জাহাজ ভাঙার পরিমাণ (মিলিয়ন LDT) ২.১ ৩.২ ২.৫
গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা (আনুমানিক) ০ ২ ৩
সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতাভুক্ত ইয়ার্ড (%) ১০% ২০% ২৫%
দূষণকারী রাসায়নিক বর্জ্য উৎপাদন (টন/বছর) ১০০,০০০+ ১২০,০০০+ ১১০,০০০+
World Bank/ADB প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষিত শ্রমিক N/A ৫,০০০+ ১০,০০০+

উৎস: বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (BSBRA), পরিবেশ অধিদপ্তর, World Bank ও ADB রিপোর্ট (বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত)।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার অবিলম্বে 'হংকং কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অফ শিপস (২০০৯)' সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো চূড়ান্ত করবে এবং এর শর্তাবলী, বিশেষ করে HazMat Inventory-এর ব্যবহার এবং বিপজ্জনক বর্জ্যের আন্তর্জাতিক মানসম্মত ব্যবস্থাপনা বাধ্যতামূলক করবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে শিল্প মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, World Bank ও ADB-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি কেন্দ্রীয় বা আঞ্চলিক বিপজ্জনক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ও নিষ্পত্তি কেন্দ্র (Common Hazardous Waste Treatment Facility) স্থাপন করবে, যা সকল জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডের বর্জ্য পরিবেশসম্মত উপায়ে ব্যবস্থাপনার সুযোগ দেবে।
  • পরিবেশ অধিদপ্তর 'গ্রিন ট্যাগ' প্রদানের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও কঠোর করবে, যেখানে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দ্বারা ইয়ার্ডগুলোর পরিবেশগত কর্মক্ষমতা নিয়মিত নিরীক্ষা করা হবে এবং 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনর্ব্যবহার বিধিমালা, ২০২২'-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator