গত ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তা সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবের ওপর ভেটো প্রদানের ঘটনা বিশ্বব্যাপী আবারও জাতিসংঘের ভেটো ক্ষমতার কার্যকারিতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১০টি অস্থায়ী এবং ৫টি স্থায়ী সদস্য – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন – যাদের হাতে রয়েছে এই বিশেষ ভেটো ক্ষমতা। এই ভেটো ক্ষমতা মূলত ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী শক্তিগুলোর মধ্যে ক্ষমতা ভারসাম্যের একটি প্রতিফলন ছিল, যা তৎকালীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছিল। তবে, বিগত দশকগুলোতে, বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে, এই ক্ষমতা প্রায়শই আন্তর্জাতিক সংকট নিরসনে বাধা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে, যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় স্বার্থ বৈশ্বিক শান্তির চেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে।
ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি সূক্ষ্ম দণ্ড। উদাহরণস্বরূপ, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য ভেটো প্রয়োগ ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং ইসরায়েলি বসতি স্থাপন বন্ধের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে বারবার ব্যাহত করেছে। একইভাবে, সিরীয় গৃহযুদ্ধে মানবিক করিডোর স্থাপন বা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রস্তাবগুলোতে রাশিয়া ও চীনের ভেটো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে এবং সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের পথকে রুদ্ধ করেছে। এই ভেটো ক্ষমতা, যা মূলত বিশ্বকে আরেকটি মহাযুদ্ধ থেকে রক্ষা করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল, তা এখন প্রায়শই বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে আদর্শগত ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে, জাতিসংঘের মতো একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, কারণ এটি অনেক সময়ই তার মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ 'আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা' থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো, যারা নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ থেকে বঞ্চিত, তারা প্রায়শই এই ভেটো ক্ষমতার শিকার হয়, যখন তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বলি হয়।
জাতিসংঘের ভেটো ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক শুধু এর ব্যবহারিক দিক নিয়েই নয়, এর কাঠামোগত ন্যায্যতা নিয়েও। ১৯৪৫ সালের বিশ্ব এখন আর নেই। তখন এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। বর্তমানে, বিশ্ব অর্থনীতি ও জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এই মহাদেশগুলোতে কেন্দ্রীভূত, কিন্তু তাদের কোনো স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব নেই। ভারতের মতো বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র এবং ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, নাইজেরিয়ার মতো উদীয়মান শক্তিগুলো নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ দাবি করে আসছে, কিন্তু বিদ্যমান ভেটো ক্ষমতার অধিকারী দেশগুলো তাদের নিজস্ব স্বার্থের কারণে সংস্কার প্রক্রিয়ায় বাধা দিচ্ছে। এই অচলাবস্থা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম (UN Peacekeeping Operations) সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব ফেলে। যখন কোনো স্থায়ী সদস্যের জাতীয় স্বার্থ ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন তারা ভেটো ব্যবহার করে শান্তিরক্ষা মিশনের ম্যান্ডেটকে প্রভাবিত করতে বা সম্পূর্ণরূপে বাতিল করতে পারে, যা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠাকে আরও কঠিন করে তোলে। যেমন, রুয়ান্ডা ও বসনিয়ার গণহত্যা রোধে জাতিসংঘের ব্যর্থতার পেছনে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে মতানৈক্য এবং ভেটো প্রয়োগের হুমকি একটি অন্যতম কারণ ছিল। এই পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে জাতিসংঘের মতো একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ক্রমবর্ধমান হারে অনুভূত হচ্ছে।
আঞ্চলিক জোট যেমন BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এবং SAARC (South Asian Association for Regional Cooperation) এর মতো সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভেটো ক্ষমতার প্রভাবকে ভিন্নভাবে দেখে। এই জোটগুলো প্রায়শই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে, যেখানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার সরাসরি প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম থাকে, তবে বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এই অঞ্চলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে। উদাহরণস্বরূপ, BIMSTEC এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো জলবায়ু পরিবর্তন বা সন্ত্রাসবাদের মতো আন্তঃসীমান্ত সমস্যা মোকাবিলায় নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করে, যা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই সম্ভব। তবে, যখন কোনো আঞ্চলিক সংকট বৈশ্বিক পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন ভেটো ক্ষমতাধর দেশগুলোর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রায়শই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখে, যেখানে ভেটো ক্ষমতা বাতিল বা সীমিত করার উপর জোর দেওয়া হয়, যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বর আরও জোরালো হয় এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়।
| দেশ | মোট ভেটো সংখ্যা | গুরুত্বপূর্ণ বিষয় (উদাহরণ) |
|---|---|---|
| রাশিয়া (সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ) | ১১৯ | সিরিয়া গৃহযুদ্ধ, ইউক্রেন সংঘাত, স্নায়ুযুদ্ধকালীন বিভিন্ন প্রস্তাব |
| মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র | ৮২ | ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত, পানামা, নিকারাগুয়া |
| যুক্তরাজ্য | ২৯ | রোডেশিয়া, সাইপ্রাস, দক্ষিণ আফ্রিকা |
| চীন (গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সহ) | ১৯ | সিরিয়া গৃহযুদ্ধ, মায়ানমার, রোহিঙ্গা সংকট (আংশিক) |
| ফ্রান্স | ১৬ | সুয়েজ সংকট, কমোরোস |
উৎস: UN Digital Library, Security Council Report (নভেম্বর, ২০২৩ পর্যন্ত সংকলিত)
সুপারিশ
- জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা সীমিত করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া যেতে পারে, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধের মতো গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের ক্ষেত্রে ভেটো প্রয়োগ নিষিদ্ধ করা হবে। এই পদক্ষেপের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে একটি প্রস্তাবনা পাস করা যেতে পারে, যা বিদ্যমান 'Uniting for Peace' রেজোলিউশনের মতো একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে, যেখানে নিরাপত্তা পরিষদ অচলাবস্থায় থাকলে সাধারণ পরিষদ বৃহত্তর দায়িত্ব নিতে পারে।
- নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যেতে পারে, এবং নতুন স্থায়ী সদস্যদের জন্য ভেটো ক্ষমতা প্রদান না করে, বরং তাদের জন্য 'সংশোধিত ভেটো' (modified veto) বা 'সম্মিলিত ভেটো' (collective veto) ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যেখানে একাধিক নতুন স্থায়ী সদস্যের যৌথ অসম্মতি ছাড়া কোনো প্রস্তাব বাতিল করা যাবে না। এই কাঠামোগত পরিবর্তন জাতিসংঘের সনদের ২১তম অধ্যায়ের সংশোধনের মাধ্যমে সম্ভব।
- জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে যাতে তারা আঞ্চলিক সংস্থা যেমন BIMSTEC এবং SAARC-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তোলে, যেখানে আঞ্চলিক সংকটগুলো স্থানীয়ভাবে সমাধান করা যায় এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার প্রভাব ছাড়াই সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা ও সংহতি বৃদ্ধি করতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই আঞ্চলিক ফোরামগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে।