স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির মহোৎসব: কেনাকাটা, সরঞ্জাম ও ওষুধে সীমাহীন… | আই নিউজ বিডি

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির মহোৎসব: কেনাকাটা, সরঞ্জাম ও ওষুধে সীমাহীন অনিয়ম

রেহনুমা তাবাসসুম  avatar   
রেহনুমা তাবাসসুম
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির মহোৎসব: কেনাকাটা, সরঞ্জাম ও ওষুধে সীমাহীন অনিয়ম
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির মহোৎসব: কেনাকাটা, সরঞ্জাম ও ওষুধে সীমাহীন অনিয়ম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণম...

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নিজেই স্বীকার করেছেন যে, বিগত অপশাসনের কারণে দেশের স্বাস্থ্য খাত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। তিনি উল্লেখ করেছেন, জনগণের অর্থসম্পদ লুটপাট ও অপচয় হয়েছে, যার ফলে জনগণ ন্যায্য স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যেখানে চিকিৎসার জন্য প্রায় ৭৩ শতাংশ খরচ জনগণকে নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ এবং ৪৮.৭ শতাংশ পরিবার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হয়।

চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়ম স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির একটি অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১৯ সালেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১১টি খাতে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে ২৫ দফা সুপারিশ করেছিল, যার মধ্যে ক্রয় অন্যতম। এই খাতগুলোতে অতি উচ্চমূল্যে নিম্নমানের সরঞ্জাম কেনা, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে উচ্চমূল্যে পণ্য কেনার অভিযোগ নিয়মিত। উদাহরণস্বরূপ, কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকার ডেন্টাল ফিলিং মেটেরিয়াল এক লাখ টাকায় এবং ২০০ টাকার টেম্পারেচার চার্ট হোল্ডার সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে। এমনকি এক্স-রে ফিল্ম না কিনেই ভুয়া বিল করে কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত ১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, গত ১৫ বছর ধরে হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ক্রয়ে দুর্নীতি ও অপচয় হয়েছে এবং বিপুল সরঞ্জাম অকেজো পড়ে আছে। মার্চ ২০২৬-এ প্রকাশিত দুদকের এক প্রতিবেদনে কোভিড-১৯ জরুরি প্রতিক্রিয়া প্রকল্পের কেনাকাটায় ১২ কোটি ৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা লুটপাটের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া, ঢাকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর কার্যালয়ের জন্য বাংলাদেশ সায়েন্স হাউস থেকে ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়েছিল, যেখানে বগুড়া ট্রেড সেন্টার ২ কোটি ২৪ লাখ ৭০ হাজার টাকায় একই সরঞ্জাম সরবরাহ করতে প্রস্তুত ছিল, ফলে সরকারের ৯০ লাখ ৩০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে।

ওষুধ কেনাকাটা ও সরবরাহেও দুর্নীতির চিত্র উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ১৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে অভিযোগ করেন যে, মানুষের জন্য বরাদ্দ সরকারি ওষুধ, অ্যান্টি-র‍্যাবিস ভ্যাকসিন, অ্যান্টি-স্নেক ভেনমসহ জরুরি ইনজেকশন হাসপাতালের বাইরে বিক্রি করা হতো। মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের ওষুধ কেনার অভিযোগও রয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়েও সম্প্রতি জটিলতা দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ ছাড়াই প্রণীত হওয়ায় তা বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে বাজারে ওষুধের মূল্য লাগামহীন হয়ে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষকে বাড়তি দামে জরুরি ওষুধ কিনতে হচ্ছে। ২০২৩ সালে সরকার নিয়ন্ত্রিত ১১৭টি ওষুধের মধ্যে ৫৩টির দাম বাড়ানো হয়েছিল, যার প্রভাব এখনো বিদ্যমান এবং গত তিন বছরে অনেক ওষুধের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) অক্টোবর ২০২৩-এ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকেও দুর্নীতির আখড়া হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে নকল ওষুধের বিস্তার এবং ঘুষ ছাড়া ফাইল না নড়ার অভিযোগ রয়েছে।

হাসপাতাল পর্যায়েও দুর্নীতি ও অনিয়ম ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুই কর্মচারীকে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক মামলা করেছে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের টেলিফোন অপারেটর মো. আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে ১০ লাখ ৬৫ হাজার ৫৬৬ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও তাকে হিসাবরক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এই হাসপাতালে এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিন নভেম্বর ২০২৪ থেকে অচল থাকায় রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে, যার মাধ্যমে পরিচালক আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (আগস্ট ২০২৪) চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি, পদে পদে হয়রানি এবং ঘুষ বাণিজ্যের কারণে রোগীদের ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, সরকারি হাসপাতালে একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র সক্রিয় থাকে, যারা অসহায় রোগীদের উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে ১ হাজার ২৮৫টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছিল, যার মধ্যে ২৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি বন্ধ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়লেও (২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা) উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার খুবই কম, যা মাত্র ৫.০৬ শতাংশ।

সুপারিশ: স্বাস্থ্য খাতের এই ভয়াবহ দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিরোধে একটি কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য। প্রথমত, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক চিহ্নিত দুর্নীতির ১১টি খাত এবং ২৫ দফা সুপারিশ দ্রুত ও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ই-টেন্ডারিং প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং ক্রয় কমিটিতে নিরপেক্ষ ও দক্ষ বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে উচ্চমূল্যে পণ্য কেনার প্রবণতা বন্ধে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ওষুধ হাসপাতালের বাইরে বিক্রি রোধে সরবরাহ চেইন ও বিতরণ ব্যবস্থায় ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শক্রমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হালনাগাদ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ন্যায্যমূল্যে ওষুধ পায়। অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে এবং লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই তাদের পদোন্নতি দেওয়া যাবে না। সর্বোপরি, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে এবং নিয়মিত নিরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: রেহনুমা তাবাসসুম

রেহনুমা তাবাসসুম, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: স্বাস্থ্য খাত, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটা।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator