সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি বছর উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫% শিক্ষার্থী দেশে ফিরে আসছেন না। এর মধ্যে স্কলারশিপ নিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও অন্তর্ভুক্ত। এই প্রবণতা দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতে এক গভীর সংকট তৈরি করছে, বিশেষ করে যখন দেশের সেরা মেধাবীরা পশ্চিমা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মোহে পড়ে স্থায়ীভাবে অভিবাসনের পথ বেছে নিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, স্কলারশিপ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও এক ধরনের অস্বচ্ছতা, এবং পরবর্তীকালে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা বহু মেধাবী শিক্ষার্থীকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গত পাঁচ বছরে, ইউজিসি-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিভিন্ন স্কলারশিপ প্রোগ্রামের আওতায় বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ১৫% তাদের গবেষণা ও অর্জিত জ্ঞান দেশের উন্নয়নে সরাসরি প্রয়োগ করতে পেরেছেন, যা দেশের বিনিয়োগের সঙ্গে তাদের প্রত্যাবর্তনের হারের এক ভয়াবহ ব্যবধান নির্দেশ করে।
এই প্রবণতার মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষত উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বাংলাদেশের মেধাবীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। উন্নত গবেষণা সুযোগ, অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনার হাতছানি শিক্ষার্থীদের এই পথে ধাবিত করছে। তবে, এর পেছনে কাজ করছে আরও গভীর কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ। দেশে উচ্চশিক্ষার মান, গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব মেধাবীদের বিদেশে পাড়ি জমানোর অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের শিক্ষার্থীরা, যারা দেশের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন, তাদের একটি বড় অংশই স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে গিয়ে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে গবেষণার সুযোগ সীমিত হওয়ায় এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও ফান্ডিং না থাকায়, প্রতি বছর প্রায় ১০,০০০ এর বেশি শিক্ষার্থী শুধুমাত্র উন্নত গবেষণার সুযোগের আশায় বিদেশে যাচ্ছেন, যার প্রায় ৬০% বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের।
অন্যদিকে, স্কলারশিপের আওতায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর দেশে ফিরে আসা শিক্ষার্থীদের জন্যও পরিস্থিতি সবসময় অনুকূল থাকে না। অনেক ক্ষেত্রেই তারা দেশে তাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থান খুঁজে পান না। দেশের শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উচ্চতর ডিগ্রিধারীদের জন্য পর্যাপ্ত পদের অভাব এবং বেতন-ভাতা পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম হওয়ায়, অনেকেই হতাশ হয়ে পুনরায় বিদেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবেন। BANBEIS-এর তথ্যমতে, গত দশকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরা প্রায় ৭০০ জন গবেষকের মধ্যে মাত্র ৪০% তাদের গবেষণার ক্ষেত্রের সাথে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন পদে নিযুক্ত হতে পেরেছেন। বাকিদের অনেকেই হয় কম বেতনের চাকরিতে যুক্ত হয়েছেন, অথবা তাদের গবেষণার সাথে সম্পর্কহীন অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্কলারশিপ নিয়ে যাওয়া কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার্থীরা, যারা দেশে ফিরেছেন, তাদের মধ্যে প্রায় ২৫% আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও দেশের শিল্প খাতে উপযুক্ত পদ খুঁজে পাচ্ছেন না, কারণ দেশের শিল্প খাত এখনও সেই উন্নত প্রযুক্তির সাথে পুরোপুরি সমন্বিত হতে পারেনি। এছাড়া, স্কলারশিপের শর্তাবলীতে অনেক সময় দেশে ফিরে নির্দিষ্ট সময় কাজ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, তা কার্যকরভাবে মনিটর করা হয় না, যা মেধাবীদের স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাসের প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
| শিক্ষাবর্ষ | বিদেশে উচ্চশিক্ষায় গমনকারী শিক্ষার্থী (মোট) | স্কলারশিপ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী | স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে স্থায়ী হওয়া (%) | দেশে ফিরে আসা ও কর্মসংস্থান (%) |
|---|---|---|---|---|
| ২০১৮-১৯ | ৫৫,০০০ | ১২,৫০০ | ৪০% | ২৮% |
| ২০১৯-২০ | ৬২,০০০ | ১৪,০০০ | ৪২% | ২৫% |
| ২০২০-২১ | ৪৮,০০০ | ১১,০০০ | ৪৫% | ২২% |
| ২০২১-২২ | ৭০,০০০ | ১৬,০০০ | ৪৮% | ২০% |
| ২০২২-২৩ | ৭৫,০০০ | ১৮,০০০ | ৫০% | ১৮% |
উৎস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি ও BANBEIS-এর যৌথ সমীক্ষা প্রতিবেদন, ২০২২-২৩
সুপারিশ
- শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি-কে যৌথভাবে 'জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল' (National Research and Innovation Fund) গঠন করতে হবে। এই তহবিল থেকে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মেধাবীরা দেশে থেকেই বিশ্বমানের গবেষণা করার সুযোগ পান এবং বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ কমে।
- NSDA এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-কে দেশের শিল্প খাতের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় সাধন করে 'স্কলারশিপ ফেরত মেধাবী কর্মসংস্থান প্রোগ্রাম' (Scholarship Returnee Employment Program) চালু করতে হবে। এই প্রোগ্রামের আওতায় বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করে দেশে ফেরা শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের অর্জিত জ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কর প্রণোদনার মাধ্যমে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে।
- শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক স্কলারশিপ চুক্তিগুলোতে 'দেশে প্রত্যাবর্তন ও সেবা বাধ্যবাধকতা আইন' (Repatriation and Service Obligation Act) কঠোরভাবে প্রয়োগের জন্য একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। এই আইনের আওতায় স্কলারশিপ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরে ন্যূনতম ৫ বছর নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেবা প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং এর লঙ্ঘনকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখতে হবে, যা ইউজিসি এবং BANBEIS-এর মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।