গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত: উদ্ভাবন থেকে উৎপাদন, মাঝের ফাঁক পূরণ হবে কবে? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত: উদ্ভাবন থেকে উৎপাদন, মাঝের ফাঁক পূরণ হবে কবে?

ড. সায়মা হুদা  avatar   
ড. সায়মা হুদা
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত: উদ্ভাবন থেকে উৎপাদন, মাঝের ফাঁক পূরণ হবে কবে?
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত: উদ্ভাবন থেকে উৎপাদন, মাঝের ফাঁক পূরণ হবে কবে?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৯টি গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের শতভাগ ব্যয় করতে সক্ষম হয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই ইঙ্গিত করে না, বরং উদ্ভাবন থেকে বাস্তব উৎপাদনে পৌঁছানোর পথে আমাদের জাতীয় আরএন্ডডি (গবেষণা ও উন্নয়ন) খাতের গভীরতর সংকটকেও উন্মোচন করে। যদিও জাতীয় বাজেট ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে গবেষণা খাতে প্রতি বছর বরাদ্দ বাড়ছে, কিন্তু সেই বরাদ্দকৃত অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার করে যুগান্তকারী উদ্ভাবন নিয়ে আসা এবং তাকে শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারেনি। এই অচলাবস্থা কেবল একাডেমিক গবেষণার সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে এক বড় প্রতিবন্ধকতা।

বাংলাদেশের আরএন্ডডি খাতে দীর্ঘদিনের একটি বড় ফাঁক বিদ্যমান, যা মূলত মৌলিক গবেষণা, প্রায়োগিক গবেষণা এবং শিল্পায়নের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে সৃষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) থেকে অসংখ্য উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি বেরিয়ে এলেও, সেগুলোর বাণিজ্যিকীকরণ বা শিল্প পর্যায়ে উৎপাদন খুব কমই দেখা যায়। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করলেও, আরএন্ডডি খাতে প্রয়োজনীয় উচ্চ-দক্ষ জনবলের অভাব প্রকট। বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে যে গবেষণা হচ্ছে, তার সাথে শিল্পের বর্তমান চাহিদা বা ভবিষ্যৎ প্রবণতার সংযোগ প্রায়শই দুর্বল। ফলস্বরূপ, গবেষণাগুলো হয়তো জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে, কিন্তু তা জাতীয় অর্থনীতিতে সরাসরি কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না। এই বিচ্ছিন্নতা গবেষণা ল্যাব এবং উৎপাদন প্ল্যান্টের মধ্যে এক দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর তৈরি করেছে, যা উদ্ভাবনের পূর্ণ সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এই ফাঁক পূরণে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (টিভিইটি) খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এই খাতেও আরএন্ডডি বিনিয়োগ ও বাস্তবায়ন পিছিয়ে আছে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিটিই) এবং স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইআইপি) এর মতো উদ্যোগগুলো দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করলেও, উদ্ভাবনী প্রযুক্তির গবেষণা ও তার প্রায়োগিক ব্যবহারকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আরএন্ডডি ল্যাব এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব স্পষ্ট। অন্যদিকে, শিল্প খাতও গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনাগ্রহী। অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান মনে করে, আরএন্ডডি-তে বিনিয়োগ একটি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যার তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়া কঠিন। এই মানসিকতা, গবেষণা ও শিল্পের মধ্যে একটি আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলস্বরূপ, দেশীয় শিল্পগুলো প্রায়শই বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল থাকে, যা একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় ঘটায়, অন্যদিকে জাতীয় উদ্ভাবনী ক্ষমতাকেও দুর্বল করে।

খাত ২০২০-২১ অর্থ বছরে আরএন্ডডি খাতে মোট বরাদ্দ (কোটি টাকা) ২০২০-২১ অর্থ বছরে আরএন্ডডি খাতে ব্যয় (কোটি টাকা) ব্যয় হার (%)
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ৮৫০ ৫৬০ ৬৬%
ইউজিসি (বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ) ১৪০ ৭৮ ৫৫.৭%
কৃষি মন্ত্রণালয় (আরএন্ডডি) ৪০০ ৩২০ ৮০%
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (আরএন্ডডি সম্পর্কিত) ৩০ ১২ ৪০%
এনএসডিএ (দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল) ২৫০ ১৮০ ৭২%

উৎস: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, ইউজিসি এবং এনএসডিএ-এর বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২১-২২)।

সুপারিশ

  • জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি (National Science and Technology Policy) সংশোধন করে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাতের মধ্যে বাধ্যতামূলক গবেষণা অংশীদারিত্বের জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা। এর ফলে ইউজিসি কর্তৃক বরাদ্দকৃত গবেষণা তহবিল শুধুমাত্র সেইসব প্রকল্পে দেওয়া হবে যেখানে শিল্প প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সম্পৃক্ততা ও co-funding থাকবে, এবং চূড়ান্ত উৎপাদনে পৌঁছানোর একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকবে।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এবং NSDA-এর সমন্বয়ে একটি 'জাতীয় দক্ষতা ও উদ্ভাবন তহবিল' (National Skills and Innovation Fund) প্রতিষ্ঠা করা। এই তহবিল থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অত্যাধুনিক R&D ল্যাব স্থাপন এবং শিল্প-সংশ্লিষ্ট প্রায়োগিক গবেষণায় বিনিয়োগ করা হবে, যার মাধ্যমে SEIP-এর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে উচ্চ-দক্ষ জনবল তৈরি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য প্রযুক্তিগত সমাধান উদ্ভাবন সহজ হবে।
  • শিল্প মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর মাধ্যমে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ কর ছাড় এবং শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা প্রদান করা, পাশাপাশি গবেষণা থেকে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার পেটেন্ট এবং বাণিজ্যিকীকরণের জন্য দ্রুত ও সহজ প্রক্রিয়াকরণের জন্য বাংলাদেশ পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (DPDT) এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. সায়মা হুদা

ড. সায়মা হুদা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator