জলবায়ু পরিবর্তন ও ডেঙ্গু মহামারী: এক নতুন সংক্রামক চ্যালেঞ্জের আদ্যোপান্ত | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জলবায়ু পরিবর্তন ও ডেঙ্গু মহামারী: এক নতুন সংক্রামক চ্যালেঞ্জের আদ্যোপান্ত

ডা. তৌহিদ হাসান  avatar   
ডা. তৌহিদ হাসান
জলবায়ু পরিবর্তন ও ডেঙ্গু মহামারী: এক নতুন সংক্রামক চ্যালেঞ্জের আদ্যোপান্ত
জলবায়ু পরিবর্তন ও ডেঙ্গু মহামারী: এক নতুন সংক্রামক চ্যালেঞ্জের আদ্যোপান্ত
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে যে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩ লাখ ২১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের ইতিহাসে এক নত...

সম্প্রতি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে যে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩ লাখ ২১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ড। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান শুধুমাত্র একটি স্বাস্থ্যগত সংকট নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সংক্রামক রোগের বিস্তার কীভাবে গভীর সম্পর্কযুক্ত, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) বারবার সতর্ক করে আসছে যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মশা-বাহিত রোগগুলির ভৌগোলিক বিস্তার এবং তীব্রতা বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে। উষ্ণ তাপমাত্রা এডিস মশার জীবনচক্রকে ত্বরান্বিত করে, ডিম ফোটার সময় কমিয়ে দেয় এবং ভাইরাস প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে, যার ফলস্বরূপ আমরা গত কয়েক বছরে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবে এক অভূতপূর্ব উল্লম্ফন দেখতে পাচ্ছি।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি ডেঙ্গু বাহক এডিস মশার প্রজনন ও বংশবিস্তারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। অধিক বৃষ্টিপাত যেমন বিভিন্ন স্থানে পানি জমে মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করে, তেমনি উচ্চ তাপমাত্রা মশার ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হওয়ার সময়কাল কমিয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, মশার ঘনত্ব বৃদ্ধি পায় এবং রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রে উল্লেখ করেছে যে, গত দুই দশকে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ০.৫ থেকে ১.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির ঘটনা বেড়েছে, যা ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশ্ব ব্যাংক (World Bank) প্রকাশিত 'Climate Change and Health in South Asia' শীর্ষক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে যে, ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে অন্তত ৩০% বৃদ্ধি পেতে পারে, যদি বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত থাকে এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়। এই পরিস্থিতি কেবল জনস্বাস্থ্যকেই নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে, কারণ ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাসের কারণে প্রতি বছর বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে।

শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা বৃষ্টিপাতের তারতম্যই নয়, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও এই সংক্রামক চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলেছে। শহরাঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে, নির্মাণাধীন ভবন, খোলা ছাদ এবং অব্যবস্থাপনা মশার প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের 'Urban Health Challenges in Asia' বিষয়ক এক সমীক্ষায় দেখিয়েছে যে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে ড্রেনেজ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এডিস মশার জন্য আদর্শ আবাসস্থল তৈরি করেছে। উপরন্তু, ডেঙ্গু সনাক্তকরণ কিট এবং চিকিৎসা সরঞ্জামাদির সরবরাহ শৃঙ্খলে ঘাটতি, বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় বিলম্ব ঘটাচ্ছে। জনসচেতনতার অভাব এবং মশার উৎসস্থল ধ্বংসের জন্য নাগরিক সম্পৃক্ততার অভাবও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পরিচালিত 'জাতীয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি'র অধীনে মশা নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা এবং এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, কিছু কীটনাশকের বিরুদ্ধে মশা প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে, যা কার্যকর মশা নিধন কর্মসূচির জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি সমন্বিত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা এখন অনস্বীকার্য।

বছর মোট ডেঙ্গু রোগী (বাংলাদেশ) মোট মৃত্যু (বাংলাদেশ) তাপমাত্রা বৃদ্ধি (গড়, °C) বিশ্ব ব্যাংকের ডেঙ্গু প্রতিরোধে সহায়তা (মিলিয়ন USD)
২০১৯ ১০১,৩৫৪ ১৭৯ ০.৬ ৫০
২০২০ ১,৪০৫ ৬ ০.৭ ২৫
২০২১ ২৮,৪২৯ ১০৫ ০.৬ ৩০
২০২২ ৬২,৩৮২ ২৮১ ০.৮ ৪০
২০২৩ ৩২১,১৭১ ১,৭০৫ ০.৯ ১০০

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, World Bank

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক 'জাতীয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি'র অধীনে প্রতি বছর একটি বিস্তারিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও অঞ্চল-নির্দিষ্ট গবেষণা পরিচালনা করা উচিত যাতে এডিস মশার প্রজননস্থল, স্থানীয় মশার কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়। এই গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে মশা নিধন কর্মসূচির কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা অপরিহার্য।
  • স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়কে (এলজিআরডি) তাদের 'নগর স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিধিমালা' কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে। বিশ্ব ব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলিতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট স্থাপন এবং নিয়মিত মশা নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করা উচিত।
  • বাংলাদেশ সরকার, 'সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮' এর অধীনে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করবে, যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই টাস্কফোর্স জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট নতুন সংক্রামক রোগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়ন করবে এবং এর কার্যকর বাস্তবায়নে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় নিশ্চিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. তৌহিদ হাসান

ডা. তৌহিদ হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator