ডিজিটাল স্বপ্নভঙ্গ: স্মার্ট প্রকল্পে অনিয়ম, ডেটা ফাঁস ও নাগরিকের ঝুঁকি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল স্বপ্নভঙ্গ: স্মার্ট প্রকল্পে অনিয়ম, ডেটা ফাঁস ও নাগরিকের ঝুঁকি

সাদমান সাকিব  avatar   
সাদমান সাকিব
ডিজিটাল স্বপ্নভঙ্গ: স্মার্ট প্রকল্পে অনিয়ম, ডেটা ফাঁস ও নাগরিকের ঝুঁকি
ডিজিটাল স্বপ্নভঙ্গ: স্মার্ট প্রকল্পে অনিয়ম, ডেটা ফাঁস ও নাগরিকের ঝুঁকি
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার প্রত্যয় যখন দেশজুড়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারকে ত্বরান্বিত করছে, তখন এই উচ্চাভিলাষী যাত্রায় দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ডেটা...

বাংলাদেশের 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার প্রত্যয় যখন দেশজুড়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারকে ত্বরান্বিত করছে, তখন এই উচ্চাভিলাষী যাত্রায় দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ডেটা সুরক্ষার গুরুতর সংকট এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। 'আই নিউজ বিডি'-র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিজিটাল বাংলাদেশের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যাপক অপচয় ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে, যা দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং স্মার্ট নগরীর ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। এই খাতগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব দেশের ডিজিটাল অগ্রগতির মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করছে।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে দুর্নীতির চিত্র ভয়াবহ। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে জানিয়েছেন যে, ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশ নিয়ে অনেক দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে এবং এসবের তদন্ত চলছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এসব প্রকল্পে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার সুফল জনগণ পুরোপুরি পায়নি। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি শ্বেতপত্রে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' রূপান্তরের আড়ালে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কোটি কোটি টাকার অস্বাভাবিক ব্যয় ও লুটপাটের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। এই শ্বেতপত্রে এটুআই (Aspire to Innovate) প্রকল্পের ব্যয় কাঠামোকে 'অস্বচ্ছ ও ফলাফলবিমুখ' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে ব্যয়ের বিপরীতে নাগরিক সেবার উন্নতি বা স্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি। অনেক ডিজিটাল টুলস ও প্ল্যাটফর্ম প্রকল্প শেষ হওয়ার পর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। এমনকি, শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবের দ্বিতীয় পর্যায়ের ৯৩৮ কোটি টাকার প্রকল্পে ৭০৮ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে, যার মধ্যে টেন্ডারের শর্ত পরিবর্তন, নিম্নমানের ক্রয় এবং নিয়োগে দুর্নীতি অন্তর্ভুক্ত। এই বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ জমা পড়েছে এবং তথ্য ও প্রযুক্তি অধিদপ্তর তদন্ত করছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে আইসিটি বিভাগের ১৯টি প্রকল্পে ক্রয়, ওয়েবসাইট তৈরি, একাডেমি স্থাপন, জমি অধিগ্রহণ এবং ভবন নির্মাণে বাড়তি খরচসহ ব্যাপক অপচয় হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও বাংলাদেশ আইসিটি খাতের অগ্রগতির সূচকে সমমানের অর্থনীতির দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে আছে। প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোতেও প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও অভিযোগ রয়েছে যে, প্রশিক্ষণের কাজ সরকারি ঘনিষ্ঠদের দেওয়া হতো এবং নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা হতো।

স্মার্ট বাংলাদেশের পথে ডেটা সুরক্ষার দুর্বলতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে 'দুর্বল অবস্থানে' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০১৯ সালে কমপারিটেকের এক প্রতিবেদনে ৬০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬ নম্বরে, যেখানে ৩৬% মোবাইল ম্যালওয়্যার আক্রান্ত ছিল। ২০২৬ সালের মে মাসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ উচ্চ সাইবার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো প্রতিদিন ১৪৫ থেকে ৬৩০টি সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। দুর্বল সাইবার প্রতিরক্ষা, নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট না করা, ডেটা এনক্রিপশনের অভাব এবং দক্ষ জনবলের সংকট এই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা হলো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ডেটা ফাঁস। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণ পায় যে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইউসিবি ব্যাংকের উপায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইবাসসহ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান তৃতীয় পক্ষের কাছে এনআইডি তথ্য ফাঁস করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিস (শোকজ) জারি করা হয়েছে। এর আগেও ২০২৩ সালের অক্টোবরে এনআইডির তথ্যভান্ডারে থাকা নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়েছিল। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ১৩তম সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা, যাতে নাগরিকদের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য ছিল, তা ফেসবুকে ৩০ থেকে ২৫০ টাকায় প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছিল। নির্বাচন কমিশন এই বিক্রির অনুমোদন দেয়নি। ২০২৫ সালের আগস্টে শপ্নো'র গ্রাহক ডেটাবেস হ্যাকারদের কবলে পড়ে, যেখানে ৪১০ গিগাবাইট ডেটা চুরি হয় এবং হ্যাকাররা $1.5 মিলিয়ন দাবি করে। শপ্নো সাত মাস ধরে গ্রাহকদের এই বিষয়ে জানায়নি, যা ডেটা সুরক্ষা আইনের দুর্বলতা প্রকাশ করে। বিজিডি ই-গভর্নমেন্ট কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (বিজিডি ই-গভ সার্ট)-এর ২০২২ সালের প্রতিবেদনেও সাইবার হামলার প্রধান কারণ হিসেবে দুর্বল পরিকাঠামোকে দায়ী করা হয়েছে।

এই গুরুতর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ (Personal Data Protection Act, 2026) প্রণয়ন করা হয়েছে, যা ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং ডেটা ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রাখে। এই আইনটিকে বাংলাদেশের প্রথম ডেটা সুরক্ষার আইনি কাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করবে। তবে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২২ সালে প্রস্তাবিত ডেটা সুরক্ষা আইনটিকে 'বিপজ্জনক বিল' হিসেবে অভিহিত করে বলেছিল যে, এটি গোপনীয়তার অধিকারকে খর্ব করতে পারে এবং কর্তৃপক্ষকে ক্ষতির জন্য আইনি প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি দিতে পারে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসের একটি প্রতিবেদনেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, নতুন ডেটা সুরক্ষা আইনটি ডেটা সুরক্ষায় ব্যর্থ হতে পারে, কারণ এতে বাধ্যতামূলক ডেটা ফাঁস বিজ্ঞপ্তির (breach notification) অভাব রয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রেতাদের জবাবদিহি করার সুস্পষ্ট কোনো প্রক্রিয়া নেই। সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ (Cyber Security Act 2023) আরেকটি প্রাসঙ্গিক আইন হলেও, এর প্রয়োগ এবং কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সামগ্রিকভাবে, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সাইবার নিরাপত্তা মেনে চলার দুর্বলতা, সচেতনতার অভাব এবং কার্যকর প্রশিক্ষণের অনুপস্থিতি ডেটা সুরক্ষার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

সুপারিশ: স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষাকে নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। প্রথমত, আইসিটি ও স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোতে সংঘটিত দুর্নীতির প্রতিটি অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রকল্পের অর্থায়ন, বাস্তবায়ন এবং নিরীক্ষায় পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন তদারকি সংস্থা গঠন করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে অবিলম্বে সংশোধন করতে হবে, বিশেষ করে বাধ্যতামূলক ডেটা ফাঁস বিজ্ঞপ্তি এবং ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রেতাদের জবাবদিহিতার সুস্পষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে, যার মধ্যে নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট, ডেটা এনক্রিপশন এবং দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তৈরি ও নিয়োগ অন্তর্ভুক্ত। চতুর্থত, সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং নাগরিকদের মধ্যে ডেটা সুরক্ষা বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। পঞ্চমত, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য সংবেদনশীল ডেটা সংরক্ষণকারী সকল প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আপগ্রেড করতে হবে এবং নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা (security audit) পরিচালনা করতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি সুরক্ষিত, স্বচ্ছ এবং প্রকৃত অর্থেই স্মার্ট জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।


🔎 অনুসন্ধানে: সাদমান সাকিব

সাদমান সাকিব, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: স্মার্ট সিটি ও ডেটা প্রাইভেসি।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator