ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা: বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত জলপথ ও বাংলাদেশের… | আই নিউজ বিডি

ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা: বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত জলপথ ও বাংলাদেশের অবস্থান

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা: বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত জলপথ ও বাংলাদেশের অবস্থান
ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা: বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত জলপথ ও বাংলাদেশের অবস্থান
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩ সালের শেষের দিকে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত জলপথে চীনের ডুবোজাহাজের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং এর প্রেক্ষিতে ভারতের নৌবাহিনীর বর্ধিত নজরদারি, এই অঞ্চলে...

সম্প্রতি, ২০২৩ সালের শেষের দিকে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত জলপথে চীনের ডুবোজাহাজের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং এর প্রেক্ষিতে ভারতের নৌবাহিনীর বর্ধিত নজরদারি, এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি (PLAN) কর্তৃক মালয়েশিয়ার সাবমেরিন বহরের আধুনিকীকরণের প্রচেষ্টা এবং ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে নৌ-অবকাঠামো জোরদার করার ঘোষণা, বঙ্গোপসাগরের স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, যা ভারত ও চীনের উভয় পক্ষের কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এক জটিল ভারসাম্যের সম্মুখীন। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ক্ষমতা প্রদর্শন এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের দৌড় বাংলাদেশের জন্য সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই নিয়ে এসেছে।

বঙ্গোপসাগর বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম বাণিজ্যিক নৌপথ, যা এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৮০% এবং চীনের তেল আমদানির ৮০% এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ভারতের জন্য, বঙ্গোপসাগর শুধুমাত্র তার 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতির কেন্দ্রবিন্দু নয়, বরং তার জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের মাধ্যমে কৌশলগত সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার জন্যও অপরিহার্য। অন্যদিকে, চীন তার 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) এর অংশ হিসেবে এই অঞ্চলে গভীর সমুদ্রবন্দর, সড়ক ও রেল যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করে চলেছে, যা তার অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিত বহন করে। মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর এবং শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের মতো প্রকল্পগুলো চীনের 'স্ট্রিং অফ পার্লস' কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচিত, যা ভারতকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার একটি প্রচেষ্টা। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পগুলো ভারত ও চীন উভয়েরই নজরে রয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দ্বার উন্মোচন করলেও, দুই পরাশক্তির মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থান ভারত ও চীনের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগের জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে ট্রানজিট সুবিধার ক্ষেত্রে। অন্যদিকে, চীন বঙ্গোপসাগরে তার বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে। বাংলাদেশ উভয় দেশের কাছ থেকে বৃহৎ আকারের অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ গ্রহণ করেছে, যা ঢাকাকে এক সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্যের মধ্যে রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, পায়রা বন্দরের উন্নয়নে চীনের বিনিয়োগ এবং ভারতের লাইন অফ ক্রেডিট (LoC) এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন, বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে এলেও, তা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের এবং প্রশংসনীয় ভূমিকা দেশটির স্বতন্ত্র নীতিকে তুলে ধরে, তবে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই ভূমিকাকে আরও জটিল করে তুলছে। BIMSTEC এর মতো আঞ্চলিক ফোরামে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ, বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর একটি প্রয়াস হলেও, বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়শই এই ধরনের আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোকে ম্লান করে দেয়।

সূচক ভারত চীন বাংলাদেশ
২০২২ সালের প্রতিরক্ষা বাজেট (বিলিয়ন USD) ৭৬.৬ ২৯২.০ ৪.৫
২০২২ সালে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্য (বিলিয়ন USD) ১১২.৩ (শুধুমাত্র ভারতের জন্য) ১,৩০০ (ঐতিহাসিকভাবে চীন ও অন্যান্য) ৯০.৪ (মোট রপ্তানি ও আমদানি)
UN Peacekeeping মিশনে সৈন্য অবদান (২০২৩) ৬,০০০+ ২,০০০+ ৭,০০০+
সার্ক (SAARC) সদস্যপদ হ্যাঁ পর্যবেক্ষক হ্যাঁ
BIMSTEC সদস্যপদ হ্যাঁ পর্যবেক্ষক হ্যাঁ

উৎস: SIPRI, WTO, UN Peacekeeping, SAARC, BIMSTEC

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ভারত ও চীনের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'নিরপেক্ষতা নীতি' (Neutrality Doctrine) প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে, যা দেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে এবং কোনো একক শক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এড়িয়ে চলবে।
  • BIMSTEC ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে আঞ্চলিক সমুদ্র নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার জন্য বাংলাদেশ কর্তৃক একটি 'বঙ্গোপসাগরীয় সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংলাপ' (Bay of Bengal Maritime Security Dialogue) আয়োজন করা উচিত, যেখানে সকল সদস্য রাষ্ট্রের সামরিক ও নৌ-কূটনীতিকদের নিয়মিত বিনিময়ের মাধ্যমে আঞ্চলিক আস্থা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।
  • পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে বহুপাক্ষিক বিনিয়োগের সুযোগ উন্মুক্ত করতে হবে এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) বা বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করে একক দেশের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করতে হবে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌম অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে সুরক্ষিত রাখবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator