ভোটের আগে ও পরে গণমাধ্যম: জনআস্থার সংকটে স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি

ভোটের আগে ও পরে গণমাধ্যম: জনআস্থার সংকটে স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ

ড. তৌফিক এলাহী  avatar   
ড. তৌফিক এলাহী
ভোটের আগে ও পরে গণমাধ্যম: জনআস্থার সংকটে স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ
ভোটের আগে ও পরে গণমাধ্যম: জনআস্থার সংকটে স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে গণমাধ্যমের ভূমিকা ...

সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে জনমনে গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, যেখানে নির্বাচনের খবর পরিবেশনে পক্ষপাতিত্ব এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার অভিযোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই প্রতিবেদন শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণমাধ্যমের দীর্ঘদিনের চলমান একটি বিতর্কেরই প্রতিচ্ছবি, যেখানে নির্বাচনকালীন সময়ে সংবাদ পরিবেশনের বস্তুনিষ্ঠতা এবং স্বচ্ছতা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় উভয়ই এই গবেষণা প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করলেও, জনমানসে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বিশেষ করে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ (বর্তমানে সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩) এবং সম্প্রচার আইন-২০১৮ (প্রস্তাবিত) এর মতো আইনগুলি গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে কতটা প্রভাবিত করেছে, তা নিয়েও জনমনে আলোচনা ও উদ্বেগ বিদ্যমান।

গণমাধ্যমের এই আস্থার সংকট শুধু দেশীয় প্রেক্ষাপটেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আন্তর্জাতিক মহলেও এর প্রভাব লক্ষ্যণীয়। বিশ্ব ব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) সহ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো বরাবরই সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্বারোপ করে থাকে। তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর পরোক্ষভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্ব ব্যাংক তাদের 'Worldwide Governance Indicators' (WGI) রিপোর্টে বাংলাদেশের 'Voice and Accountability' উপ-সূচকে ধারাবাহিক নিম্নমুখী প্রবণতা উল্লেখ করেছে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণের সীমিত পরিসরকে নির্দেশ করে। এই উপ-সূচকে ০ থেকে ১০০ এর স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর গত এক দশকে প্রায় ৫-১০ পয়েন্ট কমেছে, যা গণতন্ত্রের মৌলিক স্তম্ভগুলির দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। একইভাবে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও তাদের বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রকল্পের শর্তাবলীতে সুশাসন ও তথ্যের অবাধ প্রবাহকে অন্তর্ভুক্ত করে, যা প্রকারান্তরে গণমাধ্যমের ভূমিকাকেই শক্তিশালী করার উপর জোর দেয়। এসব আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, একটি কার্যকর ও স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া কোনো দেশেই টেকসই গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর জনগণের আস্থা কমে যায়, যা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সুশাসনের চ্যালেঞ্জকে আরও ঘনীভূত করে তোলে।

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা একটি জটিল সমীকরণের অংশ। একদিকে, গণমাধ্যম জনগণের তথ্যের চাহিদা পূরণে এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং অর্থনৈতিক চাপ প্রায়শই গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। বিশেষ করে, নির্বাচনের সময়কালে সরকারি ও বিরোধী দলের সংবাদ পরিবেশনে ভারসাম্যহীনতা, 'ফেক নিউজ' বা ভুল তথ্যের বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রদত্ত সম্প্রচার লাইসেন্স এবং বিজ্ঞাপনের উপর নির্ভরতা অনেক সময় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলিকে সরকার বা প্রভাবশালী মহলের প্রতি ঝুঁকে পড়তে বাধ্য করে। এর ফলে, সমালোচনামূলক সংবাদ পরিবেশন ব্যাহত হয় এবং জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছাতে পারে না। বাংলাদেশের সরকার, বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ প্রবর্তনের পর থেকে সংবাদকর্মীদের মধ্যে আত্ম-সেন্সরশিপের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য একটি বড় হুমকি। এই আইনটি কার্যকর হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস করছে, তেমনি অন্যদিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকেও খর্ব করছে।

সূচক ২০১৩-২০১৪ ২০১৭-২০১৮ ২০২১-২০২২ ২০২৩-২০২৪ (প্রাথমিক)
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক 'ভয়েস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি' স্কোর (০-১০০) ৩২ ২৭ ২২ ২০
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স (বৈশ্বিক র‍্যাঙ্ক) ১৪৪ ১৪৬ ১৬২ ১৬৩
টিআইবি জরিপে গণমাধ্যম নিরপেক্ষতার উপর জনআস্থা (%) ৪৫ ৩০ ২০ ১৫
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক লাইসেন্সপ্রাপ্ত অনলাইন গণমাধ্যম ৩০ ১০০ ১৮০ ২২০

উৎস: ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (WGI), রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়

সুপারিশ

  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয় কর্তৃক 'সম্প্রচার আইন-২০১৮' এর প্রস্তাবিত খসড়ায় স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের ধারা সংযোজন করা, যা গণমাধ্যমের লাইসেন্সিং, মনিটরিং এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে সরকারের প্রত্যক্ষ প্রভাবমুক্ত থাকবে এবং এর কার্যক্রমে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের অন্তর্ভুক্ত করা।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩'-এর ধারা ১৭ (মানহানি) এবং ধারা ২১ (রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা) এর মতো বিতর্কিত ধারাগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে সংশোধন করা, যাতে গণমাধ্যম কর্মীরা নির্ভয়ে জনস্বার্থে সংবাদ পরিবেশন করতে পারে এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও ADB এর সুশাসন সংক্রান্ত সুপারিশমালা বাস্তবায়নে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
  • নির্বাচন কমিশন সচিবালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটি 'নির্বাচনকালীন গণমাধ্যম আচরণবিধি' প্রণয়ন ও কঠোরভাবে প্রয়োগের ব্যবস্থা করবে, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের স্বচ্ছতা, ফেক নিউজ মোকাবেলায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সকল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের বাধ্যবাধকতা সুনির্দিষ্ট থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তৌফিক এলাহী

ড. তৌফিক এলাহী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator