ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা: কেন বারংবার ব্যর্থ হচ্ছে আমাদের কৌশল? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা: কেন বারংবার ব্যর্থ হচ্ছে আমাদের কৌশল?

ডা. আসিফ মাহমুদ  avatar   
ডা. আসিফ মাহমুদ
ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা: কেন বারংবার ব্যর্থ হচ্ছে আমাদের কৌশল?
ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা: কেন বারংবার ব্যর্থ হচ্ছে আমাদের কৌশল?
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ সালের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায়, যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর তথ্য অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের ...

২০২৩ সালের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায়, যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর তথ্য অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৩ লক্ষ ২১ হাজার ১৭১ জন এবং মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৫৮২ জন, যা পূর্ববর্তী যেকোনো বছরের রেকর্ডকে অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে, রাজধানী ঢাকার বাইরে জেলা পর্যায়গুলোতে ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যুহারের ঊর্ধ্বগতি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং নীতি নির্ধারকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতে ডেঙ্গু সংক্রমণের পুনরাবৃত্তি এবং এর ভয়াবহতা বৃদ্ধি পেলেও, জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সম্মিলিত কৌশল কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে, তা এক বড় প্রশ্ন। গত এক দশকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন ধরনের প্রচার অভিযান পরিচালিত হলেও, মশা নিধন এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়নি। বিশেষ করে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মীদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যখন দেখা যায় যে ডেঙ্গু মৌসুম আসার আগেই এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে, রোগের প্রাদুর্ভাব যখন ব্যাপক আকার ধারণ করে, তখন কেবল চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং রোগ নির্ণয়ের উপরই অধিক জোর দিতে দেখা যায়, যা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দুর্বলতাকে প্রকট করে তোলে।

জনসচেতনতা কর্মসূচির কার্যকারিতা মূল্যায়নে একটি প্রধান দুর্বলতা হলো, এর ডিজাইন এবং বাস্তবায়নে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আচরণগত মনস্তত্ত্বের অভাব। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IEDCR) এর পক্ষ থেকে প্রতি বছরই বিভিন্ন নির্দেশিকা ও প্রচারপত্র প্রকাশ করা হয়, যেখানে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। কিন্তু এই নির্দেশিকাগুলো কতটুকু কার্যকরভাবে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ সে অনুযায়ী তাদের আচরণ পরিবর্তন করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে IEDCR পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলে ডেঙ্গু সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান থাকলেও, অনেকেই জানে না যে এডিস মশা দিনের বেলায় কামড়ায় বা পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। এর অর্থ হলো, তথ্য প্রবাহে ত্রুটি রয়েছে অথবা তথ্যের উপস্থাপন পদ্ধতি এমন নয় যা মানুষের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। উপরন্তু, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা কেবল তথ্য প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী আচরণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) এর মাধ্যমে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালিত হলেও, এই কার্যক্রমে জনসম্পৃক্ততার অভাব পরিলক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ফগার মেশিনের ব্যবহার কেবল লোক দেখানো বা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে, যেখানে সাধারণ মানুষকে তাদের বাড়ির আশেপাশে জমে থাকা পানি অপসারণে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে উৎসাহিত করা হয় না। ফলে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে যে সামগ্রিক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন, তা অনুপস্থিত থাকে। জনসচেতনতা কর্মসূচির নিয়মিত মূল্যায়ন এবং কার্যকর ফিডব্যাক ব্যবস্থার অভাবও এর ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। প্রচারণার পর মানুষের আচরণে কতটা পরিবর্তন এসেছে, তা পরিমাপের জন্য নিয়মিত জরিপ বা পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয় না, যার ফলে একই ভুল বারবার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, স্বাস্থ্য বিষয়ক বার্তা প্রচারে মনস্তাত্ত্বিক কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ভীতি বা উদ্বেগ সৃষ্টি না করে, বরং দায়িত্বশীল আচরণে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সামগ্রিক কৌশল ব্যর্থ হওয়ার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, আন্তঃসংস্থা সমন্বয়হীনতা এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের অভাব। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলো মশক নিধন কার্যক্রমে নিজেদের মতো করে বাজেট বরাদ্দ করে, কিন্তু এই বাজেট কতটুকু কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রায়শই প্রশ্ন ওঠে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করলেও, এই তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণে ঘাটতি দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট এবং ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেখানে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু দেখা গেছে, ডেঙ্গু মৌসুমের পিক সময়ে কিটের সংকট তৈরি হয় বা মূল্য বৃদ্ধি পায়, যা সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ব্যবহৃত কীটনাশক এডিস মশার উপর কার্যকর নয়, যা মশক নিধন কার্যক্রমকে আরও দুর্বল করে তোলে। কীটনাশকের মান নিয়ন্ত্রণ এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা DGDA এবং DGHS এর যৌথ দায়িত্ব হলেও, এই ক্ষেত্রে নজরদারির অভাব প্রকট। জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কেবল গণমাধ্যমের উপর নির্ভর না করে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে আরও কার্যকর করা যেতে পারে, যেখানে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা ডেঙ্গু সম্পর্কে তথ্য প্রদানের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে পারেন। কিন্তু এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও রসদের অভাবে ভুগতে থাকে। ফলে, কৌশলগত পরিকল্পনা থাকলেও, তার বাস্তবায়ন এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার অভাবই ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতাকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

বছর মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত (DGHS) মোট ডেঙ্গু মৃত্যু (DGHS) জনসচেতনতা প্রচারে বরাদ্দ (MOHFW, আনুমানিক কোটি টাকা) IEDCR জনসচেতনতা জরিপ: সঠিক জ্ঞান (%)
২০১৯ ১,০১,৩৫৪ ১৭৯ ১০ ৪৩
২০২০ ১,৪০৫ ৬ ৫ ৫০
২০২১ ২৮,৪২৯ ১০৫ ৮ ৪৫
২০২২ ৬২,৩৮২ ২৮১ ১২ ৪৭
২০২৩ ৩,২১,১৭১ ১,৫৮২ ১৫ ৪৬

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) বাজেট ডকুমেন্ট, রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IEDCR) গবেষণা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) এর যৌথ উদ্যোগে একটি জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি ও কার্যকর করতে হবে, যেখানে প্রতি বছর ডেঙ্গু মৌসুমের অন্তত তিন মাস আগে থেকে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কমিউনিটি ভিত্তিক অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম (যেমন – 'ক্লিন আপ ড্রাইভ') বাধ্যতামূলক করা হবে এবং এর সফল বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ডেঙ্গু জনসচেতনতা কর্মসূচির জন্য একটি 'আচরণ পরিবর্তন যোগাযোগ কৌশল' (Behavioral Change Communication Strategy) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে কেবল তথ্য প্রদান নয়, বরং মানুষের আচরণে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে এমন মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বিপণন কৌশল (Social Marketing) ব্যবহার করা হবে, এবং এর কার্যকারিতা প্রতি বছর IEDCR দ্বারা মূল্যায়িত হবে।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট এবং মশক নিধন কীটনাশকের মান নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার উপর কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে, বিশেষ করে ডেঙ্গু মৌসুমের পূর্বে পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করা এবং যেকোনো মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা রোধে 'ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯' এর অধীনে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. আসিফ মাহমুদ

ডা. আসিফ মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator