সুন্দরবনের বুকে লবণাক্ততার আগ্রাসন: ডলফিনের আবাস সংকটে, কে শুনবে তাদের আর্তনাদ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সুন্দরবনের বুকে লবণাক্ততার আগ্রাসন: ডলফিনের আবাস সংকটে, কে শুনবে তাদের আর্তনাদ?

জাবীর হোসেন  avatar   
জাবীর হোসেন
সুন্দরবনের বুকে লবণাক্ততার আগ্রাসন: ডলফিনের আবাস সংকটে, কে শুনবে তাদের আর্তনাদ?
সুন্দরবনের বুকে লবণাক্ততার আগ্রাসন: ডলফিনের আবাস সংকটে, কে শুনবে তাদের আর্তনাদ?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI) এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে সুন্দরবনের নদী ও খালের উপরিভাগের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা অপ্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পে...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI) এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে সুন্দরবনের নদী ও খালের উপরিভাগের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা অপ্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ডলফিনের খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রজননচক্রে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষত, ইরাবতী ও গাঙ্গেয় ডলফিনের বিচরণ ক্ষেত্রগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে (ফেব্রুয়ারি-মে) লবণাক্ততা প্রতি লিটারে প্রায় ১০-১৫ পিপিটি (পার্টস পার থাউজেন্ড) পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা তাদের সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করছে। এই ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা শুধু ডলফিনের প্রজনন হার কমিয়ে দিচ্ছে না, বরং তাদের প্রধান খাদ্য উৎস – যেমন, বিভিন্ন প্রজাতির মিষ্টি ও স্বল্প-লবণাক্ত পানির মাছ – কেও বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ 'সুন্দরবন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রতিবেদন-২০২৩' এও এই উদ্বেগজনক চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত এক দশকে সুন্দরবনের কোর জোনে ইরাবতী ডলফিনের সংখ্যা প্রায় ২০% হ্রাস পেয়েছে, যার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে লবণাক্ততার আগ্রাসনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি জীববৈচিত্র্য সংকটের ইঙ্গিত দেয় না, বরং একটি জটিল বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যহীনতার অশনি সংকেত বহন করে, যা সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ ও জনজীবনের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

লবণাক্ততার এই আগ্রাসন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তন, উজানে মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের এক সম্মিলিত ফল। বিশেষ করে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গার মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে অনায়াসে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, গত ৪০ বছরে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় প্রাপ্ত মিষ্টি পানির পরিমাণ প্রায় ২৫-৩০% হ্রাস পেয়েছে, যা সরাসরি সুন্দরবনের মিঠাপানির ইকোসিস্টেমকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর ফলে, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনের প্রজাতির বিন্যাসও পরিবর্তিত হচ্ছে; লবণ-সহনশীল সুন্দরী ও গেওয়া গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং নোনা জলের গাছ যেমন কেওড়া ও বাইন-এর বিস্তার বাড়ছে। এটি বনের সার্বিক স্বাস্থ্য ও কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে, যা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে আরও ইন্ধন যোগাচ্ছে। ডলফিনের মতো সংবেদনশীল প্রাণীরা এই পরিবর্তনের প্রথম শিকার হচ্ছে, কারণ তাদের টিকে থাকার জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার লবণাক্ততা এবং পর্যাপ্ত খাদ্য মাছের উপস্থিতি অপরিহার্য। লবণাক্ত পানির কারণে তাদের ত্বকের সংক্রমণ বাড়ছে, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং এমনকি নবজাতক ডলফিনের মৃত্যুহারও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের জিনগত বৈচিত্র্যকেও হুমকির মুখে ফেলছে।

শুধুমাত্র ডলফিন নয়, সমগ্র সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য আজ সংকটাপন্ন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনের মতে, সুন্দরবনের নদীবাহিত পলি ও মিষ্টি পানির অভাবের কারণে পলিমাটির স্তর শুকিয়ে যাচ্ছে, যা ম্যানগ্রোভ বনের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর তথ্যমতে, সুন্দরবনের সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার কৃষি জমিতে লবণাক্ততা এতটাই বেড়েছে যে, সেখানে ঐতিহ্যবাহী ধান চাষ কঠিন হয়ে পড়েছে, যার ফলে কৃষকরা চিংড়ি চাষের দিকে ঝুঁকছেন। এই চিংড়ি ঘেরগুলো আবার লবণাক্ত পানি ব্যবহার করে, যা সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ জলাশয়গুলোতে লবণাক্ততা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করলেও, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, অনেক ক্ষেত্রে এই জাতগুলোও পর্যাপ্ত ফলন দিতে পারছে না। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) বিভিন্ন লবণ-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনে কাজ করলেও, প্রাকৃতিক পরিবেশের এই দ্রুত পরিবর্তন মানবসৃষ্ট উদ্যোগের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত গতিতে ঘটছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ওপর এক অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করছে, যা অদূর ভবিষ্যতে এই অনন্য ম্যানগ্রোভ বনের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

সুন্দরবনের নদীবাহিত পানির লবণাক্ততার প্রবণতা (শুষ্ক মৌসুম: ফেব্রুয়ারি-মে)
সাল গড় লবণাক্ততা (পিপিটি) ইরাবতী ডলফিনের সংখ্যা (আনুমানিক) মিষ্টি পানির মাছের প্রজাতির উপস্থিতি (শতকরা)
২০০৫ ৩.৫ ২২০ ৭৫%
২০১০ ৫.০ ১৮৫ ৬০%
২০১৫ ৭.৫ ১৫০ ৪৫%
২০২০ ১০.০ ১২০ ৩০%
২০২৩ ১২.৫ ১০০ ২০%

উৎস: বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI) এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় (সুন্দরবন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রতিবেদন)

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা' (National Climate Change Strategy and Action Plan - NCCSP) এর অধীনে সুন্দরবনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষা কর্মসূচি' (Mangrove Ecosystem Restoration and Protection Program) চালু করা, যেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন UNDP এবং IUCN এর সাথে অংশীদারিত্বে ডলফিনের বিচরণ ক্ষেত্রগুলোতে লবণাক্ততা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন করা হবে।
  • পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর যৌথ উদ্যোগে ফারাক্কা বাঁধের উজানে মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধি এবং সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোতে মিষ্টি পানি সংরক্ষণের জন্য 'সুন্দরবন রিভার বেসিন ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান' (Sundarbans River Basin Management Plan) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা, যা মিষ্টি পানির প্রবাহ নিশ্চিত করে লবণাক্ততার আগ্রাসন কমানোর মাধ্যমে ডলফিনের আবাসের উন্নতি ঘটাবে এবং DAE ও BARI এর মাধ্যমে লবণাক্ততা সহনশীল কৃষির সম্প্রসারণে সহায়তা করবে।
  • মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI) কে 'ডলফিন সংরক্ষণ আইন-২০১২' (Dolphin Conservation Act-2012) এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা, যাতে ডলফিনের প্রজনন ক্ষেত্রগুলোতে মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপ (যেমন - মাছ ধরা, নৌ চলাচল) নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং নিয়মিত ডলফিনের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও খাদ্যশৃঙ্খল বিশ্লেষণের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী 'ডলফিন স্বাস্থ্য ও আবাস পর্যবেক্ষণ প্রকল্প' (Dolphin Health and Habitat Monitoring Project) চালু করা হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাবীর হোসেন

জাবীর হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator