নগর উন্নয়নে দুর্নীতির কালো ছায়া: রাজউক-সিডিএ'র অনিয়ম ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নগর উন্নয়নে দুর্নীতির কালো ছায়া: রাজউক-সিডিএ'র অনিয়ম ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

তাসনিম হক  avatar   
তাসনিম হক
নগর উন্নয়নে দুর্নীতির কালো ছায়া: রাজউক-সিডিএ'র অনিয়ম ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
নগর উন্নয়নে দুর্নীতির কালো ছায়া: রাজউক-সিডিএ'র অনিয়ম ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের নগর উন্নয়ন খাত, বিশেষ করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের এক গভীর চক্...

বাংলাদেশের নগর উন্নয়ন খাত, বিশেষ করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের এক গভীর চক্রে আবর্তিত। ভূমি নিবন্ধন থেকে শুরু করে প্লট বরাদ্দ এবং ভবন নির্মাণ অনুমোদন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই দুর্নীতির ব্যাপকতা নাগরিক জীবনে দুর্ভোগের সৃষ্টি করছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূমি নিবন্ধন সেবার প্রতিটি পর্যায়ে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি বিদ্যমান, যেখানে দলিল নিবন্ধনে ১ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেন হয়। এমনকি দেশের ৮৯ শতাংশ তরুণ মনে করেন, দেশের উন্নয়নে দুর্নীতিই সবচেয়ে বড় বাধা। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, তদন্ত ও কিছু চাঞ্চল্যকর রায় দেশের নগর ব্যবস্থাপনার ভঙ্গুর চিত্রকেই তুলে ধরে।

সাম্প্রতিক সময়ে প্লট বরাদ্দকে কেন্দ্র করে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে রাজউকের প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির পৃথক তিনটি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ৭ বছর করে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকেও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া, সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং রাজউকের একাধিক কর্মকর্তাকেও এই মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছে। এই রায়গুলো দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বিরুদ্ধেও প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এস আলম গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানকে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার পর ২০-২৫ বছর ধরে ভবন নির্মাণ না করে জমি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া এবং ভাড়া দেওয়ার ঘটনা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে ধরা পড়েছে। এছাড়াও, সিডিএ'র কর্ণফুলী আবাসিক প্রকল্পে তিন দশক আগে প্লট বরাদ্দ হলেও এখনো নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হয়নি, যা সিডিএ'র অদূরদর্শিতা ও ব্যর্থতার প্রমাণ। সিডিএ'র ১৫টি মেগা প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি, যেখানে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দের অভিযোগ রয়েছে।

ভূমি অধিগ্রহণ এবং ভবন নির্মাণ অনুমোদনেও দুর্নীতির চিত্র ভয়াবহ। ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে বছরের পর বছর হয়রানির শিকার হন ভুক্তভোগীরা। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগে সাবেক সার্ভেয়ার মো. সেলিমকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, যেখানে জমির ক্ষতিপূরণের টাকার বিপরীতে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হতো। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় ঢাকা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (লাইন-১) জন্য ভূমি অধিগ্রহণের নামে প্রায় ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে। কক্সবাজারে মেগা প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যেখানে মেয়র, স্থানীয় রাজনীতিক এবং প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততায় ৭৮ কোটি টাকার দুর্নীতি এবং ৫৯ কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে দুদকের তদন্তে। রাজউকের ভবন নকশা অনুমোদনেও ব্যাপক ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ে ৫০ হাজার থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা এবং রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের ক্ষেত্রে ২ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। ১০ তলার বেশি ইমারতের নকশা অনুমোদনে অতিরিক্ত ১৫-৪০ লাখ টাকা এবং বিশেষ প্রকল্পের ক্ষেত্রে ১৫ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। সংসদীয় কমিটি রাজউক চেয়ারম্যানকে নকশা অনুমোদনে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছে।

রাজউক ও সিডিএ'র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিম্নপদস্থ কর্মচারীদেরও অবৈধ সম্পদ অর্জনের ঘটনা উদ্বেগজনক। হাইকোর্ট রাজউকের কর্মচারীদের বাড়ি-গাড়ি বিষয়ে অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দিতে দুদককে নির্দেশ দিয়েছেন, যেখানে স্বল্প বেতনের চাকরি করেও অনেক কর্মচারী কোটিপতি হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। এছাড়াও, রাজউকের পরিচালক মোবারক হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুটি মামলা করেছে দুদক। ক্ষমতার অপব্যবহার ও জাল কাগজপত্র তৈরি করে আবাসন প্রতিষ্ঠানকে প্ল্যান পাস করে দেওয়ার অভিযোগে রাজউকের এক পরিচালকসহ ছয় কর্মকর্তাকে তলব করেছে দুদক। এই দুর্নীতি ও অনিয়মের ফলস্বরূপ বাংলাদেশে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এক ভয়াবহ সমস্যায় পরিণত হয়েছে, যা নাগরিক সেবাবঞ্চিত করছে, বেকারত্ব বাড়াচ্ছে, পরিবেশের অবনতি ঘটাচ্ছে এবং ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে।

সরকারের পক্ষ থেকে এই খাতে দুর্নীতি দমনে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন এই খাতে দুর্নীতি ও অপব্যয় রোধে কঠোর পদক্ষেপের অঙ্গীকার করেছেন এবং স্থবির মেগা প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেছেন। অন্তর্বর্তী সরকার প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দের কোটা ব্যবস্থা বাতিল করেছে এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত চালাচ্ছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গত এক বছরে ৯২ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ভবন নির্মাণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করেছে, যা ১৬টি ধাপ থেকে ৪টি ধাপে নামিয়ে এনেছে এবং সময়সীমা ১৬৫ দিন থেকে ৫৩ দিনে কমিয়েছে। এছাড়াও, ভূমি জালিয়াতি ও প্রতারণা রোধে 'ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩' প্রণীত হয়েছে, যেখানে জালিয়াতির জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

সুপারিশ: নগর উন্নয়ন খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি: ১. রাজউক ও সিডিএ সহ সকল নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন তদারকি কমিটি গঠন করা হোক, যার সদস্যরা সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত হবে। ২. প্লট বরাদ্দ, ভূমি অধিগ্রহণ এবং ভবন নির্মাণ অনুমোদনের সকল প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা হোক এবং এতে মানুষের হস্তক্ষেপ কমিয়ে আনা হোক, যাতে ঘুষ ও অনিয়মের সুযোগ কমে আসে। ৩. দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আরও শক্তিশালী করা হোক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে দ্রুততার সাথে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হোক। ৪. 'ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩' এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হোক এবং ভূমি জালিয়াতি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হোক। ৫. নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে তার কঠোর বাস্তবায়ন করা হোক, যাতে পরিবেশ ও জনজীবনের মান উন্নত হয়। ৬. স্বল্প বেতনের কর্মচারীদের অবৈধ সম্পদ অর্জনের ঘটনাগুলো দ্রুত তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক, যাতে সমাজে একটি বার্তা যায় যে দুর্নীতি করে কেউ পার পাবে না।


🔎 অনুসন্ধানে: তাসনিম হক

তাসনিম হক, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: রাজউক, সিডিএ ও নগর উন্নয়ন।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator