পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: দুর্নীতি-অনিয়মের আবর্তে সম্ভাবনার অপচয় | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: দুর্নীতি-অনিয়মের আবর্তে সম্ভাবনার অপচয়

তৌসিফ রহমান  avatar   
তৌসিফ রহমান
পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: দুর্নীতি-অনিয়মের আবর্তে সম্ভাবনার অপচয়
পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: দুর্নীতি-অনিয়মের আবর্তে সম্ভাবনার অপচয়
ছবি: সংগৃহীত
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক বাংলাদেশ পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্বের এক অপার সম্ভাবনাময় ভূমি। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, বৃহত্...

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক বাংলাদেশ পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্বের এক অপার সম্ভাবনাময় ভূমি। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, বৈচিত্র্যময় পার্বত্য অঞ্চল এবং অসংখ্য প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এ দেশকে বিশ্ব দরবারে অনন্য করে তুলেছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিপুল সম্ভাবনা দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবে প্রতিনিয়ত মুখ থুবড়ে পড়ছে। সরকারি সংস্থাগুলোর অদক্ষতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে দেশের মূল্যবান ঐতিহ্যবাহী সম্পদ আজ সংকটাপন্ন, যা দেশের অর্থনীতি ও ভাবমূর্তির জন্য এক অশনি সংকেত।

পর্যটন খাত, যা দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারতো, তা আজ অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের (বিপিসি) অধীনে থাকা ৫১টি হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁর মধ্যে ৩৫টি পরিচালিত হচ্ছে করপোরেশন দ্বারা এবং ১৬টি ইজারা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আকর্ষণীয় স্থানে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও, আধুনিকতার অভাব, পেশাদারিত্বের ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির কারণে বেশিরভাগ ইউনিটই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আয় করতে পারছে না; বরং ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনছে, যা গত অর্থবছর (২০২২-২৩) পর্যন্ত গড়ে ১০ কোটি টাকা। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ও এই লোকসানের কারণ অনুসন্ধান করছে এবং দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা ভাবছে। এছাড়া, কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও সিলেটের মতো জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে স্থানীয় সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং পর্যটকদের হয়রানি নিয়মিত ঘটনা। বিশেষ করে কক্সবাজারে হোটেল, যানবাহন ও খাবারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং ফটোগ্রাফারদের বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পারকি সমুদ্র সৈকতে নির্মিত পর্যটন কমপ্লেক্সের মতো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও নিম্নমানের কাজ ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে বিগত সরকারের আমলের কর্মকর্তারা নির্মাণ সামগ্রী আত্মসাৎ করেছেন বলেও জানা গেছে। সম্প্রতি, হজ কার্যক্রমে দুর্নীতি, অতিরিক্ত বিমান ভাড়া আদায় এবং অপ্রয়োজনীয় টিকিটিংয়ের অভিযোগে ২৯টি ট্রাভেল এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন, যেখানে টিকিট খালি থাকা ও টিকিটিং নিয়ে অভিযোগগুলো তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। সমন্বয়হীনতা, দুর্বল অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পর্যটন খাত বছরে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার আয় হারাচ্ছে।

প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ সংরক্ষণের চিত্রও হতাশাজনক। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, যার মূল দায়িত্ব দেশের পুরাকীর্তি অনুসন্ধান, সংরক্ষণ ও গবেষণা করা, তারা মূলত খননকাজেই সীমাবদ্ধ এবং গবেষণায় পিছিয়ে রয়েছে। অধিদপ্তরের আওতাধীন দেশের ৫১৭টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি এবং ২২টি জাদুঘরের সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় রয়েছে গুরুতর ত্রুটি। লালবাগ কেল্লার হাম্মামখানা সংস্কারে রং বদলানোর অভিযোগ এবং পানাম নগর ও লালবাগ কেল্লার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো দখল হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দুর্বল তদারকির প্রমাণ। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক ড. নাহিদ সুলতানার বিরুদ্ধে চরম দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা এবং কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে তিনি অদক্ষ শ্রমিক ব্যবহার করে সংস্কার কাজ করিয়েছেন বলে জানা যায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ অরক্ষিত হয়ে পড়েছে, যার ফলে প্রত্নসম্পদ চুরি ও পাচারের ঝুঁকি বেড়েছে। সীমান্ত দিয়ে পাচারের সময় মূল্যবান পাথরের মূর্তি উদ্ধার হলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে, পাচার হওয়া সম্পদের পরিমাণ উদ্ধারকৃতের চেয়ে অনেক বেশি। জনবল সংকটের কারণেও অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ সংরক্ষণে 'পুরাকীর্তি আইন, ১৯৬৮' (The Antiquities Act, 1968) বিদ্যমান থাকলেও এর প্রয়োগে ব্যাপক দুর্বলতা রয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে খনন বা কোনো বস্তু খোঁড়ার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুমতি বাধ্যতামূলক, কিন্তু বাস্তবে এর লঙ্ঘন প্রায়শই ঘটে। অবৈধভাবে প্রত্নসম্পদ বিদেশে রপ্তানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও, 'অ্যান্টিকুইটিজ (এক্সপোর্ট কন্ট্রোল) অ্যাক্ট'-এর ফাঁকফোকর ব্যবহার করে মূল্যবান সম্পদ বিদেশে পাচার হওয়ার সুযোগ থাকে। সম্প্রতি, প্রত্নসম্পদের ক্ষতিসাধন, ধ্বংস বা ভাঙার জন্য ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রেখে একটি নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে, যা যুগোপযোগী আইনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তবে শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, এর কঠোর প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ৭৪টি স্থাপনাকে রাজউক কর্তৃক ঐতিহ্যবাহী ঘোষণা করা হলেও, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর হাইকোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও ছয় বছরেও সেগুলোর প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য নির্ণয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি।

এই দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার ফলে বাংলাদেশ তার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারাচ্ছে এবং অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো দখল ও ধ্বংস হওয়ায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে বঞ্চিত হচ্ছে। সর্বোপরি, এই খাতের সামগ্রিক দুর্বলতা দেশের টেকসই উন্নয়নে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। পর্যটন মন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন যে, দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে দেশের সব সমস্যা সমাধান সম্ভব।

সুপারিশ: বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতের এই সংকট নিরসনে একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মতো সরকারি সংস্থাগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং সুরক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ ও তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ ও গবেষণার মান উন্নত করতে হবে। তৃতীয়ত, পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় সিন্ডিকেট ও হয়রানি বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। চতুর্থত, 'পুরাকীর্তি আইন, ১৯৬৮' এবং 'অ্যান্টিকুইটিজ (এক্সপোর্ট কন্ট্রোল) অ্যাক্ট'-এর দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত যুগোপযোগী সংশোধন আনতে হবে এবং এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পরিশেষে, পর্যটন মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন এবং পর্যটন খাতের উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি একটি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো প্রকল্প নিম্নমানের কাজ বা দুর্নীতির শিকার না হয়।


🔎 অনুসন্ধানে: তৌসিফ রহমান

তৌসিফ রহমান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ।

Geen reacties gevonden


News Card Generator