ফিফা ফান্ডের গোলকধাঁধা: 'তৃণমূল' ছুঁয়ে যায় না ফুটবলের উঠোন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফিফা ফান্ডের গোলকধাঁধা: 'তৃণমূল' ছুঁয়ে যায় না ফুটবলের উঠোন

জাহিদ রিজভি  avatar   
জাহিদ রিজভি
ফিফা ফান্ডের গোলকধাঁধা: 'তৃণমূল' ছুঁয়ে যায় না ফুটবলের উঠোন
ফিফা ফান্ডের গোলকধাঁধা: 'তৃণমূল' ছুঁয়ে যায় না ফুটবলের উঠোন
ছবি: সংগৃহীত
২০২৪ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রামের সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দকৃত ফান্ডের একটি বড় অংশের অব্যবস্থাপনা এবং তৃণমূ...

২০২৪ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রামের সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দকৃত ফান্ডের একটি বড় অংশের অব্যবস্থাপনা এবং তৃণমূল পর্যায়ে তার প্রয়োগের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা কর্তৃক সদস্য দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নের জন্য প্রদত্ত এই তহবিল, যা মূলত 'ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম' নামে পরিচিত, তার লক্ষ্য ছিল মূলত তৃণমূল ফুটবলের বিকাশ, অবকাঠামোগত উন্নতি এবং জাতীয় দলগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি। অথচ, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) বিগত চার বছরে (২০২০-২০২৩) ফিফা থেকে প্রাপ্ত প্রায় $৬.৫ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে মাত্র ১৫% অর্থ সরাসরি তৃণমূল ফুটবলের জন্য ব্যয় করেছে বলে জানা গেছে। বাকি অর্থ প্রশাসনিক ব্যয়, অনিয়মিত বিদেশী কোচিং স্টাফের বেতন এবং কিছু অকার্যকর প্রকল্পের পেছনে ব্যয় হয়েছে, যা দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ফুটবলকে কার্যত ছুঁয়ে যায়নি। এই বাস্তব চিত্রই 'ফিফা ফান্ডের গোলকধাঁধা: 'তৃণমূল' ছুঁয়ে যায় না ফুটবলের উঠোন' শিরোনামের মূল উপজীব্য, যেখানে আন্তর্জাতিক সহায়তার সুফল কেন দেশের ফুটবলের মূল ভিত্তি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না, তা বিশ্লেষণ করা হবে।

ফুটবলের মতো একটি জনপ্রিয় খেলার তৃণমূল পর্যায়ের বিকাশ যেকোনো দেশের ক্রীড়া কাঠামোর মেরুদণ্ড। বাংলাদেশ সরকার, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বরাবরই তৃণমূল ফুটবলের বিকাশে গুরুত্ব আরোপ করে আসছে। কিন্তু ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রামের মতো বিশাল আকারের আর্থিক সহায়তার পরেও কেন দেশের ফুটবল তার কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারছে না, তা এক জটিল প্রশ্ন। প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, ফিফা ফরোয়ার্ড ২.০ এবং ৩.০ প্রোগ্রামের আওতায় বাংলাদেশ প্রতি ৪ বছরে প্রায় $৬ মিলিয়ন ডলারের বেশি অনুদান পেয়েছে। এই তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অবকাঠামো উন্নয়ন, যুব ফুটবল প্রতিযোগিতা, মহিলা ফুটবল এবং রেফারির প্রশিক্ষণে ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক জেলাতেই ফুটবল একাডেমিগুলো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাচ্ছে না, মাঠ সংস্কারের কাজ থমকে আছে, এবং স্থানীয় কোচদের প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে ফিফা কর্তৃক বাফুফেকে 'ফুটবল ফর স্কুলস' প্রোগ্রামের জন্য $১ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হলেও, World Bank-এর এক অনানুষ্ঠানিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের অধিকাংশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ফুটবল প্রশিক্ষণের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা প্রশিক্ষক নেই, এবং খেলার মাঠের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। এই অর্থায়ন যদি সঠিকভাবে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাতো, তবে দেশের অগণিত সম্ভাবনাময় তরুণ ফুটবলারদের জন্য একটি সুসংগঠিত প্ল্যাটফর্ম তৈরি হতে পারতো, যা জাতীয় দলের ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য ছিল।

ফান্ডের অব্যবস্থাপনার একটি বড় কারণ হলো স্বচ্ছতার অভাব এবং জবাবদিহিতা এড়ানোর প্রবণতা। ফিফার কঠোর আর্থিক বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও, বাফুফের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা এবং ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য প্রায়শই অস্বচ্ছ থাকে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) কর্তৃক সাম্প্রতিককালে ক্রীড়া খাতে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময়ও এই বিষয়টি উঠে এসেছে যে, স্থানীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (PPA) ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (PPR) ২০০৮ অনুযায়ী সরকারি এবং আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনে যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা, ফিফা ফান্ডের ব্যবহারে তার প্রতিফলন প্রায়শই দেখা যায় না। এর ফলস্বরূপ, বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিক খাতে ব্যয় না হয়ে অন্য খাতে চলে যায়, অথবা অনিয়মিতভাবে ব্যয় হয়। এমনকি, অনেক সময় ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। এই অনিয়মগুলো কেবল আর্থিক অপচয়ই নয়, বরং তৃণমূল পর্যায়ের ফুটবলারদের মনোবল নষ্ট করে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের ফুটবল উন্নয়নে বড় বাধা সৃষ্টি করে। যদি এই ফান্ডগুলো সঠিকভাবে ব্যবহৃত হতো, তবে জাতীয় দলের জন্য একটি শক্তিশালী পাইপলাইন তৈরি করা সম্ভব হতো, যা দেশের ফুটবলকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারতো।

বছর মোট ফিফা ফান্ড (মিলিয়ন USD) তৃণমূল ফুটবলে ব্যয় (মিলিয়ন USD) তৃণমূল ফুটবলে ব্যয়ের শতাংশ অন্যান্য খাতে ব্যয় (মিলিয়ন USD)
২০২০ ১.৫০ ০.২৫ ১৬.৬৭% ১.২৫
২০২১ ১.৬৫ ০.৩০ ১৮.১৮% ১.৩৫
২০২২ ১.৭৫ ০.২৫ ১৪.২৯% ১.৫০
২০২৩ ১.৬০ ০.২০ ১২.৫০% ১.৪০
সর্বমোট ৬.৫০ ১.০০ ১৫.৩৮% ৫.৫০

উৎস: ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম নিরীক্ষা প্রতিবেদন (২০২০-২০২৩), বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (২০২৩ সালের বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি থেকে প্রাপ্ত তথ্য)।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষা কমিটি গঠন করবে, যা প্রতি বছর ফিফা, World Bank এবং ADB থেকে প্রাপ্ত সকল ফুটবল ফান্ডের ব্যয় পর্যালোচনা করবে। এই কমিটির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ অডিট অধিদপ্তর (DAG) এবং কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG) অফিসের সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে, যা পাবলিক মানি (অডিট) অ্যাক্ট, ১৯৯১ অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
  • বাফুফেকে বাধ্যতামূলকভাবে ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রামের আওতায় প্রাপ্ত তহবিলের কমপক্ষে ৫০% সরাসরি তৃণমূল ফুটবল উন্নয়ন প্রকল্প, যেমন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ফুটবল একাডেমি স্থাপন, স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং স্থানীয় কোচদের প্রশিক্ষণে ব্যয় করতে হবে। এই ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (PPA) ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (PPR) ২০০৮ কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
  • তৃণমূল পর্যায়ের ফুটবল উন্নয়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতি জেলায় একটি 'জেলা ফুটবল উন্নয়ন মনিটরিং কমিটি' গঠন করতে হবে, যেখানে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অভিজ্ঞ ক্রীড়াবিদদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এই কমিটি ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হবে এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর তাদের কার্যক্রম ও ব্যয়ের প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কাছে পেশ করবে, যা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন, ২০১০ অনুযায়ী গঠিত হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহিদ রিজভি

জাহিদ রিজভি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়ন ও ফিফা ফান্ডিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator