ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা ও নগর পরিকল্পনা: সবুজ অবকাঠামো কি সমাধান? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা ও নগর পরিকল্পনা: সবুজ অবকাঠামো কি সমাধান?

স্থপতি তামিম  avatar   
স্থপতি তামিম
ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা ও নগর পরিকল্পনা: সবুজ অবকাঠামো কি সমাধান?
ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা ও নগর পরিকল্পনা: সবুজ অবকাঠামো কি সমাধান?
ছবি: সংগৃহীত
গত ২৬ জুলাই, ২০২৩ তারিখে, মাত্র দু'ঘণ্টার বৃষ্টিতে ঢাকা শহরের অধিকাংশ নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে, যা নগরবাসীকে ভয়াবহ দুর্ভোগে ফেলে। বিশেষ করে মিরপুর, ধানমন্ডি...

গত ২৬ জুলাই, ২০২৩ তারিখে, মাত্র দু'ঘণ্টার বৃষ্টিতে ঢাকা শহরের অধিকাংশ নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে, যা নগরবাসীকে ভয়াবহ দুর্ভোগে ফেলে। বিশেষ করে মিরপুর, ধানমন্ডি ২৭, ফার্মগেট এবং শান্তিনগর এলাকার প্রধান সড়কগুলো হাঁটু পানিতে তলিয়ে যায়, যেখানে গণপরিবহন স্থবির হয়ে পড়ে এবং জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। এই ঘটনা আবারও ঢাকা শহরের অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে (২০২২) উল্লেখ করা হয়েছে, গত দুই দশকে ঢাকা শহরের জলাভূমি ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রায় ৬৫% ভরাট হয়ে গেছে, যা জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ।

ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং সবুজ অবকাঠামোর অভাবই এর জন্য দায়ী। ঐতিহ্যগতভাবে, ঢাকার নগর পরিকল্পনা মূলত কংক্রিট-নির্ভর অবকাঠামো এবং ভূগর্ভস্থ পাইপ-ড্রেনেজ ব্যবস্থার উপর জোর দিয়েছে। কিন্তু এই ব্যবস্থাগুলো শহরের দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যার চাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের মোকাবিলায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ। বাংলাদেশ সরকারের নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর ও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বিগত প্রকল্পগুলো মূলত কংক্রিটের ড্রেন নির্মাণ এবং খাল খননের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যা প্রাকৃতিক জলপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এশিয়ার উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) কর্তৃক অর্থায়িত 'ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন প্রজেক্ট'-এর মতো বড় উদ্যোগগুলোও মূলত পাইপলাইন স্থাপন ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে মনোনিবেশ করেছে, কিন্তু প্রাকৃতিক জল ধারণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবনে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়েছে। এর ফলে, সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের রাস্তাগুলো কৃত্রিম নদীতে পরিণত হয়, যা নগরীর জীবনযাত্রাকে স্থবির করে দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে, 'সবুজ অবকাঠামো' বা 'Green Infrastructure' ধারণাটি ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সবুজ অবকাঠামো বলতে বোঝায় এমন এক পরিকল্পনা যেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশের উপাদানগুলোকে (যেমন - গাছপালা, মাটি, জলাভূমি) ব্যবহার করে শহরের পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য রেইন গার্ডেন (Rain Garden) তৈরি, permeable pavement (পানি শোষণকারী রাস্তা), সবুজ ছাদ (Green Roof), বৃষ্টির পানি সংগ্রহের পদ্ধতি এবং প্রাকৃতিক জলাভূমি ও খাল পুনরুদ্ধার। এই পদ্ধতিগুলো বৃষ্টির পানিকে মাটির গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বৃদ্ধি করে এবং একই সাথে সারফেস রানঅফ (Surface Runoff) কমিয়ে জলাবদ্ধতা হ্রাস করে। উদাহরণস্বরূপ, সিঙ্গাপুর ও সিউলের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো সফলভাবে সবুজ অবকাঠামো ব্যবহার করে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ এবং নগর পরিবেশের উন্নতি ঘটিয়েছে। ঢাকার মতো একটি মেগা-সিটিতে, যেখানে অপরিকল্পিতভাবে জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে, সেখানে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং সবুজায়ন অত্যাবশ্যক। এটি কেবল জলাবদ্ধতা কমাবে না, বরং নগরীর তাপমাত্রা হ্রাস, বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, যা একটি 'স্মার্ট সিটি'র অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

তবে, সবুজ অবকাঠামো বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ঢাকার উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং সীমিত খোলা জায়গা এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধান বাধা। এছাড়া, সঠিক ভূমি ব্যবহার নীতি এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাবও একটি বড় সমস্যা। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে অনেক সময় প্রকল্পগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়। বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণা (২০২০) অনুযায়ী, ঢাকার সবুজ অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল থাকলেও, এর সুষ্ঠু ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব পরিলক্ষিত হয়। তবুও, বিদ্যমান খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, সরকারি ও বেসরকারি ভবনের ছাদে সবুজায়নের উদ্যোগ এবং পাবলিক স্পেসগুলোতে রেইন গার্ডেন তৈরির মাধ্যমে সীমিত পরিসরে হলেও সবুজ অবকাঠামো বাস্তবায়ন সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা এবং নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ ও স্থপতিদের মধ্যে নিবিড় সহযোগিতা।

সূচক ২০১০ ২০২০ পরিবর্তন
শহুরে এলাকার আয়তন (বর্গ কিমি) ২৬৮ ৩২৪ +২১%
জলাভূমি ও উন্মুক্ত স্থানের অনুপাত (%) ১৪% ৮% -৪৩%
প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতার গড় ঘটনা (দিন) ১২ ২৮ +১৩৩%
সবুজ অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ (মিলিয়ন ডলার) ৪৫ ৮২ +৮২%

উৎস: বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS), বিশ্বব্যাংক (World Bank) ও ADB প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • ঢাকা শহরের বিদ্যমান জলাশয়, খাল এবং প্রাকৃতিক নিষ্কাশন পথগুলো পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যেমন - স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়) কর্তৃক 'ঢাকা জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০' এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
  • গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) কর্তৃক নতুন ভবন নির্মাণে 'সবুজ ছাদ' (Green Roof) এবং 'বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ' (Rainwater Harvesting) পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করার জন্য নির্মাণ বিধিমালায় সুনির্দিষ্ট ধারা সংযোজন করা এবং এর কঠোর পরিবীক্ষণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'জাতীয় নগর পরিকল্পনা নীতি' (National Urban Policy) পুনর্গঠন করে সবুজ অবকাঠামোকে মূল উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিশ্বব্যাংক ও ADB এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের সাথে সমন্বয় করে সবুজ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: স্থপতি তামিম

স্থপতি তামিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্মার্ট সিটি, আরবান প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator