নিট ফলন শূন্য: গবেষণায় বিনিয়োগের ফসল কি শুধু ভিনদেশি মাটি? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নিট ফলন শূন্য: গবেষণায় বিনিয়োগের ফসল কি শুধু ভিনদেশি মাটি?

ড. জহিরুল ইসলাম  avatar   
ড. জহিরুল ইসলাম
নিট ফলন শূন্য: গবেষণায় বিনিয়োগের ফসল কি শুধু ভিনদেশি মাটি?
নিট ফলন শূন্য: গবেষণায় বিনিয়োগের ফসল কি শুধু ভিনদেশি মাটি?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪ (খসড়া) অনুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষা গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত তহবিলের একটি উল্লেখযো...

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪ (খসড়া) অনুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষা গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষ করে, যে গবেষণাগুলো উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন বা নতুন উদ্ভাবনের দিকে পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর সুফল দেশের অর্থনীতিতে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, গবেষণা সম্পন্ন হওয়ার পর মেধাবী গবেষকরা উন্নত সুযোগের সন্ধানে বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন, যা দেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদী শূন্যতা তৈরি করছে। এই প্রবণতা 'নিট ফলন শূন্য' ধারণাকে আরও জোরালো করছে, যেখানে দেশের বিনিয়োগের ফসল ভিনদেশি মাটি উর্বর করছে।

এই মেধা পাচারের পেছনে একাধিক কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং অবকাঠামোর অভাব। যদিও সরকার প্রতি বছর গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, যেমন ইউজিসি-র মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা অনুদান প্রদান করা হচ্ছে, কিন্তু এই বিনিয়োগের একটি বড় অংশ মৌলিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ থাকছে, যা শিল্প বা বাণিজ্যিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে খুব বেশি ফলপ্রসূ হচ্ছে না। অন্যদিকে, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করলেও, উচ্চতর গবেষণা ও উদ্ভাবনী দক্ষতার জন্য একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারেনি। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবিত পেটেন্ট বা প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ অত্যন্ত সীমিত। স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রিধারীরা যখন দেশে তাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগানোর মতো পর্যাপ্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নত ল্যাবরেটরি বা শিল্প-ভিত্তিক গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) বিভাগে কর্মসংস্থান খুঁজে পান না, তখন তারা সহজেই উন্নত দেশের আকর্ষণীয় প্রস্তাবগুলোতে সাড়া দেন। বৈশ্বিক মেধা বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শুধুমাত্র ডিগ্রি প্রদান নয়, বরং গবেষণার বাণিজ্যিকীকরণ এবং উদ্ভাবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দেওয়া অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, দেশের নীতিগত কাঠামো এবং শিল্প-শিক্ষার সংযোগের দুর্বলতা মেধা পাচারের অন্যতম অনুঘটক। যদিও সরকার বিভিন্ন সময়ে Skill for Employment Investment Program (SEIP) এর মতো প্রকল্প হাতে নিয়েছে যা দক্ষ জনবল তৈরিতে সহায়তা করছে, কিন্তু এই প্রকল্পগুলো মূলত প্রাথমিক ও মধ্যম স্তরের দক্ষতার উপর বেশি জোর দেয়। উচ্চশিক্ষিত ও গবেষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, গবেষণা-ভিত্তিক শিল্প পার্ক স্থাপন বা স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের অভাব প্রকট। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করলেও, তাদের জন্য গবেষণা-ভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার হতাশাজনক। উপরন্তু, দেশে মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ এবং উদ্ভাবকদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য আইনগত সুরক্ষা দুর্বল হওয়ায়, অনেক উদ্ভাবক তাদের কাজের সম্পূর্ণ সুফল ভোগ করতে পারেন না। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায়শই আকর্ষণীয় ফেলোশিপ, উন্নত গবেষণা পরিবেশ এবং ভবিষ্যতে নিশ্চিত কর্মসংস্থানের প্রস্তাব দিয়ে থাকে, যা দেশের মেধাবীদের জন্য এক অনিবার্য আকর্ষণ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং উদ্ভাবনী সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি, যাতে গবেষণার ফলাফল শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখতে পারে।

প্রতিষ্ঠানের নাম খাত ২০২২-২৩ অর্থবছরে গবেষণা/দক্ষতা উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ (কোটি টাকা) ব্রেন ড্রেন সংক্রান্ত প্রবণতা/পর্যবেক্ষণ
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) উচ্চশিক্ষা গবেষণা ৩৫০ উচ্চতর ডিগ্রিধারী গবেষকদের মধ্যে বিদেশমুখী প্রবণতা বৃদ্ধি; গবেষণার বাণিজ্যিকীকরণ সীমিত।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ৬০০ দক্ষ জনবল তৈরি হলেও, উচ্চতর কারিগরি গবেষণায় নিযুক্তদের মধ্যে উন্নত দেশের আকর্ষণ।
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) দক্ষতা উন্নয়ন ১৫০ প্রাথমিক ও মধ্যম স্তরের দক্ষতার উপর বেশি জোর; উচ্চতর দক্ষতা সম্পন্নদের বিদেশ গমন।
Skill for Employment Investment Program (SEIP) দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান ১০০০ (প্রকল্প ভিত্তিক) নির্দিষ্ট সেক্টরে দক্ষতা বাড়ালেও, গবেষণা ও উদ্ভাবনী কর্মসংস্থান তৈরিতে সীমাবদ্ধতা।

উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন (খসড়া ২০২৪), অর্থ মন্ত্রণালয় বাজেট বরাদ্দ প্রতিবেদন ২০২২-২৩, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক কার্যবিবরণী।

সুপারিশ

  • দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য 'জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল আইন' প্রণয়ন করে একটি স্থায়ী তহবিল গঠন করা হোক। এই তহবিল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধুমাত্র মৌলিক গবেষণার জন্য নয়, বরং শিল্প-ভিত্তিক গবেষণা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য অনুদান প্রদান করা হবে এবং এর মাধ্যমে উদ্ভাবনী স্টার্টআপগুলোকে 'স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড' এর অধীনে ইনকিউবেশন ও ফিনান্সিং এর সুযোগ দেওয়া হবে, যা মেধাবীদের দেশে রাখতে উৎসাহিত করবে।
  • সরকার 'মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ও বাণিজ্যিকীকরণ আইন' সংশোধন করে উদ্ভাবকদের মেধাস্বত্ব অধিকার আরও সুদৃঢ় করুক এবং এই আইনের অধীনে 'জাতীয় উদ্ভাবন বাণিজ্যিকীকরণ বোর্ড' প্রতিষ্ঠা করা হোক। এই বোর্ড ইউজিসি, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত হবে, যার কাজ হবে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ এবং দেশীয় শিল্পে এর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এবং BANBEIS এর যৌথ উদ্যোগে একটি 'হাই-স্কিলড ট্যালেন্ট রিটেনশন প্রোগ্রাম' চালু করা হোক। এই প্রোগ্রামের আওতায় উচ্চশিক্ষিত এবং দক্ষ গবেষকদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো, উন্নত গবেষণা অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার স্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ করা হবে, যাতে Skill for Employment Investment Program (SEIP) এর মতো প্রকল্পগুলো শুধু দক্ষতা তৈরি নয়, বরং উচ্চতর মেধাকে দেশে ধরে রাখতেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. জহিরুল ইসলাম

ড. জহিরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator