সম্প্রতি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রকাশিত এক যৌথ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (NCDs) যেমন ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ও কার্ডিওভাসকুলার রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৬৭% মৃত্যুর কারণ এই রোগগুলো। এই পরিস্থিতিতে, প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে এবং ব্যক্তিগতকৃত ঔষধ (Personalized Medicine) বা নির্ভুল চিকিৎসার (Precision Medicine) ধারণাটি বাংলাদেশে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। বিশেষত, জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহার এই NCDs এবং অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে, যেখানে প্রতিটি রোগীর জিনগত কাঠামো, জীবনধারা এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করে নির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব হবে।
ব্যক্তিগতকৃত ঔষধের মূল ভিত্তি হলো জিনোমিক্স, যা মানুষের জিনগত তথ্যের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে রোগের প্রবণতা, ঔষধের প্রতি প্রতিক্রিয়া এবং চিকিৎসার কার্যকারিতা নির্ধারণে সহায়তা করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, সংক্রামক রোগ যেমন যক্ষ্মা (TB) বা হেপাটাইটিস ভাইরাসের ড্রাগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা (Drug Resistance) নির্ণয়ে জিনোমিক সিকোয়েন্সিং একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ইন্সটিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) কিছু নির্দিষ্ট প্যাথোজেনের জিনোমিক নজরদারি শুরু করেছে, যা রোগের বিস্তার এবং বিবর্তন বুঝতে অপরিহার্য। এই ধরনের প্রযুক্তি কেবল রোগ নির্ণয়কে দ্রুত করে না, বরং নতুন ঔষধের লক্ষ্যবস্তু সনাক্তকরণ এবং কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে, এই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং বিপুল বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জগুলো এখনও প্রকট।
অন্যদিকে, উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির মধ্যে বায়োইনফরমেটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং মেশিন লার্নিং (ML) জিনোমিক ডেটা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অপরিহার্য। বাংলাদেশের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (NIMH) মানসিক স্বাস্থ্যের জিনোমিক ভিত্তি নিয়ে গবেষণার সম্ভাবনা অন্বেষণ করছে, যা মানসিক অসুস্থতার ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসায় সহায়ক হতে পারে। এই প্রযুক্তিগুলো বিশাল জিনোমিক ডেটা সেট থেকে অর্থপূর্ণ তথ্য নিষ্কাশন করে, যা চিকিৎসকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। কিন্তু, এসব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার ল্যাব, ডেটা স্টোরেজ সুবিধা এবং ডেটা সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। এছাড়াও, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কে জিনোমিক্স-ভিত্তিক থেরাপি এবং ডায়াগনস্টিকের অনুমোদন প্রক্রিয়াকে আধুনিকীকরণ করতে হবে, যাতে এই নতুন চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো দ্রুত এবং নিরাপদে রোগীদের কাছে পৌঁছাতে পারে।
| সূচক | ২০১৩ | ২০১৮ | ২০২৩ (আনুমানিক) |
|---|---|---|---|
| ক্যান্সারে মৃত্যুর হার (প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায়) | ৭২.৫ | ৭৮.৩ | ৮৫.১ |
| ডায়াবেটিসে আক্রান্ত জনসংখ্যা (%) | ৫.৯% | ৭.৫% | ৯.৩% |
| গবেষণা ও উন্নয়নে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় (জিডিপি'র %) | ০.০১% | ০.০২% | ০.০৩% |
| জিনোমিক্স গবেষণায় বিনিয়োগ (মিলিয়ন USD) | ০.১ | ০.৫ | ১.২ |
উৎস: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), DGHS বার্ষিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদন, এবং স্থানীয় গবেষণা পত্রিকা
সুপারিশ
- স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) একটি জাতীয় জিনোমিক্স কৌশলপত্র প্রণয়ন করুক, যেখানে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ এবংDGHS এর তত্ত্বাবধানে একটি কেন্দ্রীয় জিনোমিক ডেটা হাব প্রতিষ্ঠার রূপরেখা থাকবে।
- ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) দ্রুত জিনোমিক্স-ভিত্তিক ঔষধ ও ডায়াগনস্টিক কিটের অনুমোদন প্রক্রিয়াকে সহজ ও গতিশীল করার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করুক এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতি রেখে নতুন প্রবিধানমালা তৈরি করুক।
- ইন্সটিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) এবং ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (NIMH) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে বায়োইনফরমেটিক্স ও জিনোমিক্স গবেষণার জন্য অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করুক।