চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ: সম্ভাবনা নাকি নতুন ঝুঁকি? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ: সম্ভাবনা নাকি নতুন ঝুঁকি?

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ: সম্ভাবনা নাকি নতুন ঝুঁকি?
চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ: সম্ভাবনা নাকি নতুন ঝুঁকি?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮' (Bangladesh Ship Recycling Act, 2018) এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা প্রণয়নের পর, চট...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮' (Bangladesh Ship Recycling Act, 2018) এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা প্রণয়নের পর, চট্টগ্রাম উপকূলে জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছে, যেখানে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই রোডম্যাপের অধীনে, সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু কর সুবিধা ও অবকাঠামোগত সহায়তার প্রস্তাব করেছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আসা পুরনো জাহাজগুলোর পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিদেশি প্রযুক্তি ও পুঁজির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।

বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প, যা বিশ্বের মোট জাহাজ ভাঙার প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি কাজ করে থাকে, দীর্ঘকাল ধরে পরিবেশ দূষণ এবং শ্রমিক সুরক্ষার দুর্বলতার জন্য সমালোচিত। তবে, বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা এই চিত্র বদলাতে পারে। বিশ্বব্যাংকের (World Bank) এক সমীক্ষা অনুযায়ী, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে জাহাজ ভাঙার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই বিনিয়োগের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশি পুঁজি থেকে আসতে পারে, যা শিল্পটিকে 'হংকং কনভেনশন' (Hong Kong International Convention for the Safe and Environmentally Sound Recycling of Ships, 2009) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা (EU Ship Recycling Regulation No 1257/2013) মেনে চলার সক্ষমতা বাড়াবে। ফলস্বরূপ, শুধুমাত্র পরিবেশগত উন্নতিই নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে এবং স্থানীয় শ্রমিকদের দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হবে। এটি বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে, যেখানে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত ইস্পাত এবং অন্যান্য মূল্যবান ধাতু উৎপাদন একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত।

তবে, বিদেশি বিনিয়োগের আগমন নতুন কিছু ঝুঁকির ইঙ্গিতও দেয়। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অপরিকল্পিত বা অনিয়ন্ত্রিত বিদেশি বিনিয়োগের ফলে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন, যা শিল্পের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে। তাছাড়া, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের নিজস্ব পরিবেশগত মানদণ্ড নিয়ে এলেও, বাংলাদেশের দুর্বল নজরদারি এবং আইনি প্রয়োগের অভাবে তারা সেগুলোর সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন নাও করতে পারে। এর ফলে, পরিবেশগত এবং শ্রমিক সুরক্ষার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এছাড়াও, পুঁজি পাচার এবং স্থানীয় সম্পদের উপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পাওয়ার মতো বিষয়গুলোও সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন, যা দেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে যদি বাংলাদেশ সরকার কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে। বিদেশি বিনিয়োগের শর্তাবলী এবং চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

সূচক ২০১২ ২০১৭ ২০২২ প্রক্ষেপিত (২০২৭)
মোট জাহাজ ভাঙার পরিমাণ (মিলিয়ন টন) ৭.৫ ৯.২ ১২.১ ১৫.০
কর্মসংস্থান (সরাসরি, হাজার) ৫০ ৭০ ৯৫ ১২০
রপ্তানি আয় (পুনঃপ্রক্রিয়াজাত ধাতু, মিলিয়ন ডলার) ১১০ ১৫০ ২২০ ৩০০
পরিবেশগত মানদণ্ড পরিপালন (%) ১৫ ২৫ ৪০ ৬৫
বিদেশি বিনিয়োগ (সঞ্চিত, মিলিয়ন ডলার) ০ ০.৫ ৫.০ ৫০.০

উৎস: বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কর্তৃপক্ষ (BSRA) ও World Bank এর প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কর্তৃপক্ষ (BSRA) এবং শিল্প মন্ত্রণালয়কে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'বিনিয়োগ নির্দেশিকা' (Investment Guideline) প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে পরিবেশগত সুরক্ষা, শ্রমিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় অংশীদারিত্বের শর্তাবলী সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। এই নির্দেশিকায় 'হংকং কনভেনশন' এবং 'EU Ship Recycling Regulation' এর প্রতিটি ধারা মেনে চলার বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  • পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) এর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে বিদেশি বিনিয়োগের আওতায় পরিচালিত জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে পরিবেশ ও শ্রম আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ ও নিয়মিত তদারকি করা যায়। বিশেষ করে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য 'পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন' (EIA) এবং 'সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন' (SIA) বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং এর ফলাফলের ভিত্তিতে বিনিয়োগ অনুমোদন দিতে হবে।
  • অর্থ মন্ত্রণালয়কে বিদেশি বিনিয়োগ চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে 'দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি' (Double Taxation Avoidance Agreement) এবং 'বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি' (Bilateral Investment Treaties) এর আওতায় স্থানীয় অর্থনীতির উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিরূপণ করতে হবে। একই সাথে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের থেকে 'প্রযুক্তি হস্তান্তর' (Technology Transfer) এর শর্তাবলী বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে স্থানীয় শিল্প এই উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Geen reacties gevonden


News Card Generator