জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: গাজায় যুদ্ধাপরাধের দায় কার, নীরবতা কি… | আই নিউজ বিডি

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: গাজায় যুদ্ধাপরাধের দায় কার, নীরবতা কি নতুন নীতি?

তানিয়া সুলতানা  avatar   
তানিয়া সুলতানা
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: গাজায় যুদ্ধাপরাধের দায় কার, নীরবতা কি নতুন নীতি?
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: গাজায় যুদ্ধাপরাধের দায় কার, নীরবতা কি নতুন নীতি?
ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) গত ২৬ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলার প্রাথমিক রায়ে...

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) গত ২৬ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলার প্রাথমিক রায়ে ইসরায়েলকে গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিলেও, পরবর্তী মাসগুলোতে পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। বরং, জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (OCHA) এর তথ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের গাজায় খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবার তীব্র সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিমালা এবং যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত জেনেভা কনভেনশনগুলির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই রায় এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং জাতিসংঘের ভূমিকার ওপর গভীর প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে, বিশেষত যখন বিশ্ব সংস্থাটি তার প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

গাজায় চলমান সংঘাতের ফলে উদ্ভূত মানবিক বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংস্থা ও আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (ICC) যদিও যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার রাখে, তবে এর কার্যকারিতা প্রায়শই রাজনৈতিক প্রভাব এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলির অসহযোগিতার কারণে সীমিত থাকে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ১৯৯৮ সালের রোম সংবিধির স্বাক্ষরকারী হওয়ায় ICC-এর এখতিয়ার গাজা উপত্যকায় সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে, এবং ইতোমধ্যে প্রধান প্রসিকিউটর করিম খান গাজা ও পশ্চিম তীরে সংঘটিত সম্ভাব্য অপরাধের তদন্ত শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে, এই তদন্তের গতি ও পরিধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষত যখন ইসরায়েল ICC-এর এখতিয়ার অস্বীকার করে এবং অনেক প্রভাবশালী রাষ্ট্র, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপকে সমর্থন করে না। এই পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দ্বৈত মানদণ্ড এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের প্রাধান্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ এবং তাদের নিজস্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলির ভিন্ন ভিন্ন নীতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ গ্রহণের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, যেমন UN Peacekeeping মিশনগুলি, সাধারণত সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি বজায় রাখতে এবং মানবিক সহায়তা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু গাজার ক্ষেত্রে, UN Peacekeeping-এর মতো সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত, কারণ এটি ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে একটি সার্বভৌম সংঘাত, যেখানে জাতিসংঘের সরাসরি সামরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের ঐকমত্য প্রয়োজন, যা বর্তমানে প্রায় অসম্ভব। এর পরিবর্তে, জাতিসংঘের মানবিক সংস্থাগুলি, যেমন UNRWA (United Nations Relief and Works Agency for Palestine Refugees in the Near East), গাজার বেসামরিক নাগরিকদের জন্য জীবনরক্ষাকারী সহায়তা প্রদান করছে, কিন্তু তাদের কার্যক্রমও ইসরায়েলের সামরিক অবরোধ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে, UNRWA-এর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযোগ এবং কিছু পশ্চিমা দেশের তহবিল স্থগিতের সিদ্ধান্ত সংস্থাটির কার্যকারিতাকে আরও দুর্বল করেছে, যা গাজার মানবিক সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আঞ্চলিক সংস্থাগুলি, যেমন BIMSTEC বা সার্ক, যদিও সরাসরি এই সংঘাতে জড়িত নয়, তবে তাদের সদস্য রাষ্ট্রগুলি সম্মিলিতভাবে জাতিসংঘের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারতো যাতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে, এই সংস্থাগুলোর নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং ঐক্যমতের অভাব তাদের ভূমিকা পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

গাজায় মানবিক সংকট ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার কিছু পরিসংখ্যান
সূচক পরিমাণ/শতাংশ সময়কাল/সূত্র
গাজায় নিহত বেসামরিক নাগরিক (আনুমানিক) ৩০,০০০+ মার্চ ২০২৪, ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়
আভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষ প্রায় ১.৭ মিলিয়ন (গাজার মোট জনসংখ্যার ৭৫%) ফেব্রুয়ারি ২০২৪, OCHA
তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মানুষ প্রায় ৯৩% (গাজার মোট জনসংখ্যার) জানুয়ারি ২০২৪, Integrated Food Security Phase Classification (IPC)
শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার (উত্তর গাজা) ১৫.৬% (২ বছরের কম বয়সী) ফেব্রুয়ারি ২০২৪, UNICEF
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ভেটো ৪ বার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক) অক্টোবর ২০২৩ - ফেব্রুয়ারি ২০২৪
UNRWA-কে তহবিল স্থগিতকারী দেশ ১৬টি (প্রাথমিকভাবে) জানুয়ারি ২০২৪

উৎস: ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, OCHA, IPC, UNICEF, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নথি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা।

সুপারিশ

  • জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা সংস্কার করে, বিশেষ করে গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধের মতো গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের ক্ষেত্রে, স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের উপর নির্দিষ্ট শর্তাবলী আরোপ করা হোক, যা জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায়ের অধীনে মানবিক হস্তক্ষেপের পথ সুগম করবে।
  • আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (ICC) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ)-এর আর্থিক ও লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হোক, যাতে তারা সদস্য রাষ্ট্রগুলির রাজনৈতিক চাপমুক্ত থেকে গাজাসহ বিশ্বের অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে, রোম সংবিধির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে।
  • জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ, বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলির মাধ্যমে, জেনেভা কনভেনশনগুলির অতিরিক্ত প্রোটোকল এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অন্যান্য বিধানগুলি মেনে চলার জন্য ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষকে চাপ প্রয়োগ করুক এবং ব্যর্থ হলে জাতিসংঘ সনদের ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য একটি কার্যকর প্রক্রিয়া তৈরি করা হোক।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানিয়া সুলতানা

তানিয়া সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator