নতুন কারিকুলামে শিখন পদ্ধতি: প্রশ্নবিদ্ধ মূল্যায়ন ও শিক্ষকদের প্রস্তুতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নতুন কারিকুলামে শিখন পদ্ধতি: প্রশ্নবিদ্ধ মূল্যায়ন ও শিক্ষকদের প্রস্তুতি

কাজী মাকসুদুল হক  avatar   
কাজী মাকসুদুল হক
নতুন কারিকুলামে শিখন পদ্ধতি: প্রশ্নবিদ্ধ মূল্যায়ন ও শিক্ষকদের প্রস্তুতি
নতুন কারিকুলামে শিখন পদ্ধতি: প্রশ্নবিদ্ধ মূল্যায়ন ও শিক্ষকদের প্রস্তুতি
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে শুরু হওয়া নতুন কারিকুলামের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দেশব্যাপী...

সম্প্রতি ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে শুরু হওয়া নতুন কারিকুলামের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দেশব্যাপী আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন শিখন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়নে শিক্ষকদের প্রস্তুতি এবং মূল্যায়নের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক স্তম্ভকে নাড়া দিয়েছে। বিশেষ করে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক আয়োজিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালাগুলোর কার্যকারিতা এবং শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তাদের ভূমিকা যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছে। অনেক শিক্ষকই অভিযোগ করেছেন যে, স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণগুলো নতুন পদ্ধতির মূল্যায়নের জটিলতা অনুধাবন এবং কার্যকরভাবে প্রয়োগ করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে, নতুন কারিকুলামের শিখন পদ্ধতি, বিশেষ করে এর মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং শিক্ষকদের প্রস্তুতি নিয়ে একটি গভীর বিশ্লেষণ অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।

নতুন কারিকুলামের মূল উদ্দেশ্য হলো মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন (Experiential Learning) এবং যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন (Competency-Based Assessment) চালু করা। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের শুধু জ্ঞান অর্জন নয়, বরং অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার সক্ষমতা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রথাগত পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তে এখন বছরব্যাপী শিখনকালীন মূল্যায়ন এবং সামষ্টিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্স যাচাই করা হচ্ছে। তবে, শিক্ষকরা বলছেন, এই নতুন পদ্ধতির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, যেমন – নির্দেশিকা, রুব্রিকস এবং পর্যাপ্ত সময় তাদের হাতে নেই। ২০২২ সালের ব্যানবেইস (BANBEIS) প্রকাশিত শিক্ষক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৩.৫ লক্ষ শিক্ষক কর্মরত আছেন, যাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশই নতুন শিক্ষাক্রমের বিস্তারিত দিক সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নন। অনেক শিক্ষকই তাদের নিজস্ব সৃজনশীলতা এবং পূর্ব অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পরিচালনা করছেন, যার ফলে মূল্যায়নের মানদণ্ডে একরূপতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর যদিও কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় যোগ্যতাভিত্তিক কারিকুলাম বহু আগে থেকেই বাস্তবায়ন করে আসছে, কিন্তু সাধারণ শিক্ষায় এর সফল প্রয়োগে যে ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন ছিল, তা এখনো দৃশ্যমান নয়।

মূল্যায়নের এই জটিলতা শুধুমাত্র শিক্ষকদের প্রস্তুতির অভাবে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সাথে জড়িত রয়েছে পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাবও। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্স ডেটা ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণের জন্য যে ধরনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা সফটওয়্যার প্রয়োজন, তা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি। এর ফলে, শিক্ষকরা ম্যানুয়ালি ডেটা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ সৃষ্টি করছে এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগের অপ্রাপ্যতা বা ধীরগতিও এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) উচ্চশিক্ষায় গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে এই নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতিকে সফল করতে যে ধরনের প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক সহায়তা প্রয়োজন, তা সমন্বিতভাবে প্রদানের ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রচারে কাজ করলেও, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি এবং এর বাস্তবায়ন পরিলক্ষিত হয়নি, যা নতুন কারিকুলামের লক্ষ্য অর্জনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিষ্ঠানের নাম ভূমিকা সাম্প্রতিক পদক্ষেপ/পরিসংখ্যান (উদাহরণ)
শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত। ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নতুন কারিকুলাম চালু।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণের উপকরণ তৈরি। ২০২৩-২৪ সালে প্রায় ৪ লক্ষ শিক্ষককে স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ প্রদান (বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদন অনুযায়ী)।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) মাঠ পর্যায়ে শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন ও শিক্ষকদের তত্ত্বাবধান। ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ শিক্ষকদের জন্য প্রায় ৫ দিনের অনলাইন/অফলাইন প্রশিক্ষণ আয়োজন।
ব্যানবেইস (BANBEIS) শিক্ষা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ। ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে মোট শিক্ষক ৩,৫৯,৩২৮ জন।
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) জাতীয় দক্ষতা কাঠামো তৈরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা প্রসারে সহায়তা। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে প্রায় ৩০,০০০ জনকে দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রদান (সরাসরি প্রাথমিক/মাধ্যমিক শিক্ষক সম্পর্কিত নয়, তবে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রসারে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ)।

উৎস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি, মাউশি, ব্যানবেইস ও এনএসডিএ-এর প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন ও ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে।

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এনসিটিবি কর্তৃক নতুন কারিকুলামের মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর শিক্ষকদের জন্য ন্যূনতম ৩০ দিনের একটি সমন্বিত ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা উচিত, যা প্রতিটি শিক্ষককে মূল্যায়নের রুব্রিকস, ডেটা সংগ্রহ এবং ফলাফলের ব্যাখ্যায় পারদর্শী করে তুলবে।
  • মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর যৌথভাবে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে যেখানে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শিখনকালীন মূল্যায়নের ডেটা সংরক্ষণ করতে পারবেন, এবং এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ ও প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার নিশ্চিত করার জন্য একটি সময়বদ্ধ প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এর যৌথ উদ্যোগে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন পদ্ধতি প্রয়োগে উচ্চতর ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট কোর্স চালু করা, যা শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করবে এবং এর সফল বাস্তবায়নকারী শিক্ষকদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কাজী মাকসুদুল হক

কাজী মাকসুদুল হক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator