রোহিঙ্গা শিবিরে অস্থিরতা: ত্রাণে অনিয়ম ও অপরাধের বিস্তার | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

রোহিঙ্গা শিবিরে অস্থিরতা: ত্রাণে অনিয়ম ও অপরাধের বিস্তার

আরাফাত হোসেন  avatar   
আরাফাত হোসেন
রোহিঙ্গা শিবিরে অস্থিরতা: ত্রাণে অনিয়ম ও অপরাধের বিস্তার
রোহিঙ্গা শিবিরে অস্থিরতা: ত্রাণে অনিয়ম ও অপরাধের বিস্তার
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলো বর্তমানে এক গভীর সংকটের মুখে, যেখানে মানবিক সহায়তার আড়ালে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার উদ্ব...

বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলো বর্তমানে এক গভীর সংকটের মুখে, যেখানে মানবিক সহায়তার আড়ালে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আই নিউজ বিডি-র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া এই অঞ্চল এখন শুধু মানবিক সংকট নয়, বরং নিরাপত্তা ও সুশাসনের এক বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হত্যা, অপহরণ, মাদক পাচার, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয়দের জীবনযাত্রায়ও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। একইসাথে, আন্তর্জাতিক সহায়তা তহবিল ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে, যা এই মানবিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও এনজিও খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আসা আন্তর্জাতিক ত্রাণ তহবিলের অপব্যবহার এবং এনজিও কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ইউএনএইচসিআর পরিচালিত রোহিঙ্গা সহায়তা প্রকল্পগুলোতে গুরুতর অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও ত্রাণ সহায়তার অপব্যবহারের চিত্র উঠে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, রোহিঙ্গাদের জন্য ১ লাখ ৮২ হাজার ডলার মূল্যের চামচ, কাঁটাচামচ ও ছুরি কেনা হয়েছিল, যা তাদের খাওয়ার জন্য অপ্রয়োজনীয় ছিল। এছাড়াও, ২২ লাখ ডলার বা ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৯টি হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়, যা পরে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এই ধরনের অপচয় ও অনিয়মের খেসারত শেষ পর্যন্ত অসহায় রোহিঙ্গাদেরই দিতে হচ্ছে, যাদের জীবন আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। অতীতেও, কিছু এনজিওর বিরুদ্ধে শর্ত ভঙ্গ করার অভিযোগ উঠেছে, যেমন 'মুক্তি-কক্সবাজার' নামের একটি এনজিওর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে বিতরণের জন্য প্রায় ১০ হাজার নিড়ানি (ধারালো অস্ত্র) তৈরির অভিযোগ উঠেছিল, যার ফলে তাদের ছয়টি প্রকল্প স্থগিত করা হয়। এছাড়া, ২০১৭ সালে মুসলিম এইড, ইসলামিক রিলিফ ও আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশন নামের তিনটি এনজিওকে ত্রাণকাজে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, কারণ তাদের বিরুদ্ধে ত্রাণ বিতরণের নামে ভিন্ন কিছু করার অভিযোগ ছিল। এই ধরনের ঘটনাগুলো এনজিও খাতের দুর্বল নজরদারি ও জবাবদিহিতার অভাবকেই প্রকট করে তোলে।

ক্যাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে যে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং অপরাধী চক্রের সহিংসতা থেকে রক্ষা করার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আরসা (ARSA) ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বেড়েছে, যা হত্যা, অপহরণ, মাদক পাচার, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী তৎপরতার মূল কারণ। ২০২৫ সালের জুন মাসে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (ICG) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিতে পারে। এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং ক্যাম্পে কর্মরত দেশি-বিদেশি এনজিও কর্মীরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মানবপাচারও একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে, যেখানে রোহিঙ্গারা প্রধান লক্ষ্য। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা রোহিঙ্গাদের মানবপাচারের ঝুঁকির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, ২০২৫ সালে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে যাত্রা করেছেন, যার মধ্যে প্রায় ৯০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে, সরকার ক্যাম্প কেন্দ্রিক অপরাধ দমনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি যৌথ টহল জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা কমে আসাও রোহিঙ্গা সংকটের একটি বড় দিক। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইউনিসেফ জানিয়েছে যে, রোহিঙ্গাদের জন্য বৈশ্বিক সহায়তার পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে কমে এসেছে, যার ফলে শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম সংকুচিত হচ্ছে এবং স্থানীয় অনেক মানুষ চাকরি হারাচ্ছেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোয় তহবিল সংকটের মুখে পড়েছে শিক্ষা কার্যক্রম-সংশ্লিষ্ট একাধিক বেসরকারি সংস্থা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) অনুদান বন্ধের ঘোষণার পর বেশ কিছু এনজিও তাদের কর্মীদের ছাঁটাই করেছে এবং কিছু শিক্ষাকেন্দ্রে তহবিল বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও ইউনিসেফ জানিয়েছে যে, সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়া শিক্ষাকেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করা হয়েছে, তবে তহবিল সংকট সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি প্রকল্পসহ উন্নয়নমূলক কাজকে ব্যাহত করছে। এই তহবিল সংকট রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টিকেও কঠিন করে তুলছে, কারণ মিয়ানমার এখনও তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এনজিও কার্যক্রমের সমন্বয়হীনতা এবং জবাবদিহিতার অভাব একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। ২০১৭ সালেই অভিযোগ উঠেছিল যে, ক্যাম্পগুলোতে অর্ধশতাধিক এনজিও প্রায় ১৩০টি কর্মসূচি চালালেও অর্ধেকের বেশি রোহিঙ্গা পূর্ণ সহায়তা পায়নি, যার প্রধান কারণ ছিল সমন্বয়হীনতা। অনেক এনজিও জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই কাজ করছে, যার ফলে তাদের কার্যক্রমের কোনো হিসাব বা তথ্য প্রশাসনের কাছে নেই। কিছু এনজিওর বিরুদ্ধে প্রত্যাবাসন বিরোধী অপপ্রচার চালানো এবং রোহিঙ্গাদের উস্কে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে, যা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। এমনকি, অবৈধভাবে পাহাড় কেটে নতুন ক্যাম্প তৈরির অভিযোগও উঠেছে কিছু এনজিওর বিরুদ্ধে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। এই ধরনের অনিয়ন্ত্রিত ও অসঙ্গতিপূর্ণ কার্যক্রম কেবল মানবিক সহায়তার উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করছে না, বরং রোহিঙ্গা সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।

সুপারিশ: রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী অডিট কমিটি গঠন করা হোক, যার কাজ হবে সকল দেশি-বিদেশি এনজিওর তহবিল ব্যবহার এবং কার্যক্রম নিয়মিত নিরীক্ষা করা। এই কমিটির কাছে এনজিও ব্যুরো, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত তথ্য থাকবে এবং এর প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে, যাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায় এবং দায়ী ব্যক্তি বা সংস্থাকে আইনের আওতায় আনা যায়। একইসাথে, ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এনজিও ও রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক।


🔎 অনুসন্ধানে: আরাফাত হোসেন

আরাফাত হোসেন, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও এনজিও (NGO) অডিট।

No se encontraron comentarios


News Card Generator