শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির কালো থাবা: নিয়োগ বাণিজ্য ও এমপিও অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির কালো থাবা: নিয়োগ বাণিজ্য ও এমপিও অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র

মহিউদ্দিন নবী  avatar   
মহিউদ্দিন নবী
শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির কালো থাবা: নিয়োগ বাণিজ্য ও এমপিও অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র
শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির কালো থাবা: নিয়োগ বাণিজ্য ও এমপিও অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা, যা জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার মূল ভিত্তি, সাম্প্রতিক সময়ে গভীর অনিয়ম ও দুর্নীতির জালে আটকা পড়েছে। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া এ...

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা, যা জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার মূল ভিত্তি, সাম্প্রতিক সময়ে গভীর অনিয়ম ও দুর্নীতির জালে আটকা পড়েছে। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং এমপিওভুক্তির মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে, যা মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থ আর ক্ষমতার দাপটকেই প্রতিষ্ঠিত করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের শেষ ছয় মাসে (১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর) পরিচালিত নিরীক্ষায় ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৯০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়েছে। এই অনিয়মের মধ্যে রয়েছে জাল বা ভুয়া সনদে শিক্ষক নিয়োগ, অগ্রহণযোগ্য সনদ ব্যবহার, অবৈধ নিয়োগ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং ১৭৬ একর সরকারি জমি বেহাত। এই ধরনের ব্যাপক দুর্নীতি শিক্ষার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলছে।

শিক্ষক নিয়োগে 'বাণিজ্য' এখন একটি ওপেন সিক্রেট। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ নিয়মিত শোনা যায়। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। যেমন, রংপুরের মিঠাপুকুরের বছির উদ্দিন ডিগ্রি কলেজে অফিস সহকারী ও ল্যাব সহকারী পদে নিয়োগের জন্য অধ্যক্ষ ১০ লাখ ও সাড়ে তিন লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। দিনাজপুরের ভাতগাঁও শিক্ষা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে গোপনে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ এবং তাদের অনুপস্থিতিতে বেতন-ভাতা তোলার অভিযোগ উঠেছে। মেহেরপুরে অনুমোদন ছাড়া শ্রেণি শাখা খুলে শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিওভুক্তির অভিযোগে চার শিক্ষকের এমপিও স্থগিত করা হয়েছে। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠান সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশে নিয়োগ পরীক্ষায় ফাঁকফোকর তৈরি করে পছন্দের প্রার্থীদের পাশ করানোর জন্য গোপনে পরীক্ষা আয়োজনের অভিযোগও রয়েছে। এমনকি নীলফামারীর সৈয়দপুরে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে স্থানীয়রা শিক্ষা কর্মকর্তাদের আটকে রেখেছিল, যেখানে পছন্দের তিন প্রার্থীর কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ ছিল। এমপিও (মাসিক পরিশোধ আদেশ) প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও দুর্নীতি ব্যাপক। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমপিও কার্যক্রমে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে শিক্ষা বিভাগের ৮৬ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। তারা এমপিওভুক্তির নথি আটকে রেখে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এবং অর্থের বিনিময়ে ফাইল নিষ্পত্তির সময় বাড়ানো-কমানো হয়। মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষকরাও এমপিও বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) থেকে সরিয়ে আবারও ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আলোচনায় এসেছে। গত ১০ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় এনটিআরসিএকে কেবল শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রত্যয়নের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়, যা শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জোরালো কণ্ঠস্বর উঠেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ যুব ফ্রন্ট এবং জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন সংগঠন ও শিক্ষাবিদরা এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাদের মতে, ২০১৫ সালে এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ ব্যবস্থা চালুর ফলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগে ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছিল। পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে গেলে স্থানীয় প্রভাব, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের সুযোগ আবারও বাড়বে, যা শিক্ষার মানকে আরও তলানিতে নিয়ে যাবে। শিক্ষামন্ত্রী ড. এ এন এম এহসানুল হক মিলন যদিও বলেছেন যে, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা ইতিমধ্যেই পরিচালনা কমিটির হাতে ফিরে গেছে, যা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে এই দুর্নীতির লাগাম টানতে বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেননকে গত জুলাই ২০২৬-এ গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) শিক্ষক নিয়োগে ইউজিসির নীতিমালা অমান্য করার অভিযোগে সদ্য সাবেক উপাচার্যসহ পাঁচ শিক্ষক-কর্মকর্তাকে তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। শিক্ষা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পঙ্গু হওয়ার পথে। শিক্ষামন্ত্রী নিজেও ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত শিক্ষা খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে আসা ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করার কথা জানিয়েছেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, দুর্নীতির শেকড় গভীরে প্রোথিত এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ অপরিহার্য।

সুপারিশ: শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অবিলম্বে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। এনটিআরসিএকে আরও শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করে মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। জাল সনদধারী শিক্ষক ও নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) মতো সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে নিয়মিত ও নিবিড় তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাদের তদন্ত প্রতিবেদনগুলোর ভিত্তিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একইসাথে, এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও ডিজিটাল করে মানবীয় হস্তক্ষেপ কমিয়ে আনতে হবে, যাতে দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ হয়।


🔎 অনুসন্ধানে: মহিউদ্দিন নবী

মহিউদ্দিন নবী, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিও বাণিজ্য।

コメントがありません


News Card Generator