নির্বাচনী প্রচারে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার: স্বচ্ছতা না… | আই নিউজ বিডি

নির্বাচনী প্রচারে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার: স্বচ্ছতা না বিভ্রান্তির জাল?

ড. তৌফিক এলাহী  avatar   
ড. তৌফিক এলাহী
নির্বাচনী প্রচারে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার: স্বচ্ছতা না বিভ্রান্তির জাল?
নির্বাচনী প্রচারে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার: স্বচ্ছতা না বিভ্রান্তির জাল?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (বিইসি) আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডিজিটাল প্রচারণার উপর কঠোর নজরদারির ঘোষণা দিয়েছে, বিশেষ করে সামাজিক যো...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (বিইসি) আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডিজিটাল প্রচারণার উপর কঠোর নজরদারির ঘোষণা দিয়েছে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুল তথ্য ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানো রোধে তাদের সাইবার মনিটরিং সেলের কার্যক্রম জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পদক্ষেপটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণার ক্রমবর্ধমান প্রবণতার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে একদিকে যেমন প্রার্থীরা অল্প সময়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারছেন, তেমনই অন্যদিকে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য বা 'ফেক নিউজ'-এর মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করার ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডিজিটাল অপপ্রচারের ব্যাপকতা এবং এর ফলে জনমনে সৃষ্ট আস্থার সংকট, বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে, যেখানে তারা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উপর জোর দিয়েছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সহজলভ্যতা ও দ্রুত প্রচার ক্ষমতা নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে দ্বিমুখী প্রভাব ফেলছে। ইতিবাচক দিক থেকে, এটি ছোট দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য প্রচলিত গণমাধ্যমের ব্যয়বহুল প্রচারণার বিকল্প হিসেবে কাজ করে, যা নির্বাচনী প্রতিযোগিতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। প্রার্থীরা সরাসরি ভোটারদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন, তাদের নীতি ও প্রতিশ্রুতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে পারেন এবং রিয়েল-টাইম ফিডব্যাক গ্রহণ করতে পারেন। তবে, এর নেতিবাচক দিকগুলো আরও জটিল। বেনামি অ্যাকাউন্ট, বট এবং বিদেশি প্রভাব বিস্তারকারী গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য, গুজব, এবং প্রতিপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য অপপ্রচার চালানো হয়, যা ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নির্বাচনী অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়ানো ভুল তথ্যের দ্রুত বিস্তার, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও তীব্র করছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, নির্বাচনী প্রচারণায় ডিজিটাল মাধ্যমগুলোর ব্যবহার কেবল তথ্যের আদান-প্রদান নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, গত পাঁচ বছরে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেলেও, ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার অভাব অনেককেই ডিজিটাল অপপ্রচারের সহজ শিকারে পরিণত করছে। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ডিজিটাল স্পেসে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা করার চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তেমনই অন্যদিকে প্রথাগত গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো প্রায়শই তাদের নিজস্ব অ্যালগরিদম এবং তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে, যা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তা বা এজেন্ডাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, ফলে নির্বাচনী বিতর্কের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ভোটারদের কাছে পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য পৌঁছানোর সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

বছর ডিজিটাল প্রচারে বিনিয়োগ (USD মিলিয়ন) ভুল তথ্যের কারণে নির্বাচনী অভিযোগের হার (%) নির্বাচন কমিশনের সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধি (%)
২০১৪ ১০.২ ১২ ১৫
২০১৮ ২৫.৫ ৩৫ ৩০
২০২৩ ৪০.০ ৬০ ৫০

উৎস: বাংলাদেশ সরকার (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ), World Bank (Governance Indicators), ADB (Regional Economic Outlook) এর সমন্বিত বিশ্লেষণ।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী একটি সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী মনিটরিং ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, যেখানে সাইবার ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বাধীন সেল সার্বক্ষণিক ভুল তথ্য ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য শনাক্ত করবে এবং সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে দ্রুত অপসারণের জন্য বাধ্য করবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে (যেমন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়) World Bank-এর সহযোগিতায় একটি জাতীয় ডিজিটাল সাক্ষরতা ও মিডিয়া লিটারেসি প্রোগ্রাম চালু করতে হবে, যা ভোটারদেরকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করার দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে, বিশেষত নির্বাচনী প্রচারণার সময়।
  • বাংলাদেশ সরকার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায়, একটি 'নির্বাচনী ডেটা ট্রাস্ট ফান্ড' প্রতিষ্ঠা করবে, যা ডিজিটাল প্রচারে ব্যবহৃত সকল আর্থিক লেনদেন এবং ডেটা ব্যবহারের একটি স্বচ্ছ ও নিরীক্ষণযোগ্য রেকর্ড সংরক্ষণ করবে, যাতে নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অর্থের অপব্যবহার রোধ করা যায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তৌফিক এলাহী

ড. তৌফিক এলাহী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator