অপ্রকাশিত সত্য: সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ কাটার নেপথ্যে অদৃশ্য হাত ও জীববৈচিত্র্যের নীরব কান্না | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অপ্রকাশিত সত্য: সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ কাটার নেপথ্যে অদৃশ্য হাত ও জীববৈচিত্র্যের নীরব কান্না

জাবীর হোসেন  avatar   
জাবীর হোসেন
অপ্রকাশিত সত্য: সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ কাটার নেপথ্যে অদৃশ্য হাত ও জীববৈচিত্র্যের নীরব কান্না
অপ্রকাশিত সত্য: সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ কাটার নেপথ্যে অদৃশ্য হাত ও জীববৈচিত্র্যের নীরব কান্না
ছবি: সংগৃহীত
অপ্রকাশিত সত্য: সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ কাটার নেপথ্যে অদৃশ্য হাত ও জীববৈচিত্র্যের নীরব কান্না

অপ্রকাশিত সত্য: সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ কাটার নেপথ্যে অদৃশ্য হাত ও জীববৈচিত্র্যের নীরব কান্না

২০২৩ সালের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দশকে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের প্রায় ৪.২% কমে গেছে, যা উদ্বেগজনকভাবে পূর্ববর্তী দশকের তুলনায় ১.৫% বেশি। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং অদৃশ্য শক্তির দ্বারা পরিচালিত ধ্বংসযজ্ঞের এক নীরব দলিল। সম্প্রতি, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলে অবৈধভাবে ম্যানগ্রোভ কাটার একটি বড় চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, দেশের অমূল্য এই প্রাকৃতিক ঢাল কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার নয়, বরং মানবসৃষ্ট লোভ ও অব্যবস্থাপনারও বলি হচ্ছে।

ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের নেপথ্যে একাধিক কারণ থাকলেও, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের মদদে অবাধে কাঠ পাচার ও চিংড়ি ঘের সম্প্রসারণই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বন বিভাগ নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়ানোর দাবি করলেও, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে চোরাকারবারিরা নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে তাদের অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে, সুন্দরবনের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে ভূমি দখলের প্রবণতা বাড়ছে, যেখানে ম্যানগ্রোভ কেটে চিংড়ি চাষের জন্য লবণাক্ত জলের প্রবেশপথ তৈরি করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় শুধু গাছই কাটা হচ্ছে না, মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়ে আশেপাশের কৃষি জমিও অনুর্বর হয়ে পড়ছে, যা স্থানীয় কৃষকদের জীবনযাত্রাকেও কঠিন করে তুলছে। DAE (Department of Agricultural Extension) এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে ধানের উৎপাদনশীলতা প্রায় ২০-২৫% কমে গেছে, যা স্থানীয় অর্থনীতির উপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের এই অব্যাহত ক্ষয় শুধু বনজ সম্পদ ধ্বংস করছে না, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনের অনন্য জীববৈচিত্র্যের উপর। Royal Bengal Tiger, চিত্রা হরিণ, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, পাখি এবং সামুদ্রিক প্রাণীর বাসস্থান ও প্রজনন ক্ষেত্রগুলি সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। BARC (Bangladesh Agricultural Research Council) এর আওতাধীন মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ম্যানগ্রোভ কেটে ফেলায় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রগুলি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় মাছের প্রজাতি ও পরিমাণ উভয়ই হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে, কাঁকড়া ও গলদা চিংড়ির লার্ভার প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় এই প্রজাতিগুলির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে, যা সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করছে। BRRI (Bangladesh Rice Research Institute) এর গবেষণায় দেখা গেছে, ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের কারণে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলীয় এলাকার ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলস্বরূপ কৃষি জমি ও জনবসতি আরও বেশি করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে পড়ছে।

বছর ম্যানগ্রোভ আচ্ছাদিত এলাকা (বর্গ কিমি) ম্যানগ্রোভ হ্রাসের হার (দশমিক %) ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি (আনুমানিক কোটি টাকা)
২০০০-২০০৯ ৪,১০৫ ২.৭% ১,২০০
২০১০-২০১৯ ৩,৯৯৫ ৪.২% ৩,৫০০
২০২০-২০২২ ৩,৯১০ ১.৫% (৩ বছরে) ২,২০০

উৎস: পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বন বিভাগ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় (বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত আনুমানিক তথ্য)।

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে সুন্দরবন সুরক্ষা আইন, ১৯৯৬ এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে, অবৈধ কাঠ পাচার ও ভূমি দখলের সাথে জড়িত প্রভাবশালী চক্রকে চিহ্নিত করে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে হবে এবং বন অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল সক্রিয় করতে হবে।
  • DAE এবং BARI-কে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি প্রচলনের জন্য গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে, যাতে স্থানীয়রা ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের পরিবর্তে টেকসই জীবিকার দিকে ঝুঁকতে পারে।
  • BARC-এর মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ বনায়ন কর্মসূচিতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে, যা সুন্দরবন সংরক্ষণ ও স্থানীয়দের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাবীর হোসেন

জাবীর হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator