খাদ্যে ভেজাল: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

খাদ্যে ভেজাল: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চ্যালেঞ্জ

ফারজানা আহমেদ  avatar   
ফারজানা আহমেদ
খাদ্যে ভেজাল: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চ্যালেঞ্জ
খাদ্যে ভেজাল: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে খাদ্য ভেজাল এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, এমনকি প্রায় ৪...

বাংলাদেশে খাদ্য ভেজাল এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, এমনকি প্রায় ৪০ থেকে ৭৬ শতাংশ খাদ্যদ্রব্যেই কোনো না কোনোভাবে ভেজাল মেশানো হচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। দুধের পরিমাণ বাড়াতে বিপজ্জনক ইনজেকশন থেকে শুরু করে ফলমূল ও শাকসবজিতে হরমোন ও কীটনাশক, মুড়িতে ইউরিয়া সার, মসলায় ইটের গুঁড়া, এবং হলুদ ও লবণে সীসা ও অন্যান্য ধাতব উপাদান মেশানো হচ্ছে। এমনকি মুরগির মাংসে ভারী ধাতু এবং খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। এসব ভেজাল খাদ্যের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে এবং ৪৫ লাখ মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীরা এর ভয়াবহ শিকার হচ্ছেন, যা ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের মারাত্মক ক্ষতি, হজমের সমস্যা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং জন্মগত ত্রুটির মতো রোগের কারণ হচ্ছে।

খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং ভেজাল রোধে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর অধীনে ২০১৫ সালে গঠিত হয় বিএফএসএ, যার লক্ষ্য মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। বিএসটিআই পণ্যের মান নির্ধারণ ও গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে কাজ করে এবং নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও নজরদারি অভিযান পরিচালনা করে। সম্প্রতি (আগস্ট ২০২৬) বিএফএসএ নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ লঙ্ঘনের দায়ে ৭টি প্রতিষ্ঠানকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে এবং ৭টি মামলা দায়ের করেছে। একই সময়ে তারা ১৩০টি খাদ্য প্রতিষ্ঠানে মনিটরিং চালিয়েছে। বিএসটিআইও রমজান মাসকে কেন্দ্র করে ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করে, যেখানে ৭৩৭টি খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে ৪৭টি নিম্নমানের হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নকল ও অবৈধ পণ্য বিক্রি বন্ধে বিএসটিআই বিটিআরসিকে চিঠি দিয়েছে এবং ১৫টি অনলাইন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে।

তবে, এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইন প্রয়োগে দুর্বলতা এবং ছোট অঙ্কের জরিমানা ভেজালকারীদের জন্য যথেষ্ট প্রতিরোধক হচ্ছে না। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর জন্য মৃত্যুদণ্ড বা ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও, বাস্তবে এর প্রয়োগ খুবই সীমিত। অভিযোগ রয়েছে যে, বিএসটিআই-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানেও অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপকতা রয়েছে, যা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কিছু প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভেজালের মাত্রা বাড়লেও সামগ্রিকভাবে ভেজালবিরোধী অভিযান কমেছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফার লোভে ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে ভেজাল খাদ্য তৈরি করছে, আর মাঠ পর্যায়ে সঠিক ও নিয়মিত তদারকির অভাবে এই প্রবণতা বাড়ছে।

ভেজাল খাদ্যের ধরনও সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। এখন শুধু পানি মেশানো নয়, বরং গরুর শরীরে বিপজ্জনক ইনজেকশন দিয়ে দুধের পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে, ফলকে আকর্ষণীয় করতে হরমোন ও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে, এমনকি তরমুজের ভেতর লাল টকটকে দেখাতে সিরিঞ্জে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ঢুকানো হচ্ছে। এসব রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে কিডনি ও লিভারের ক্ষতি, ক্যান্সার এবং অন্যান্য জটিল রোগ দেখা দিচ্ছে। শিশুদের ক্ষেত্রে মেলামাইনযুক্ত দুধ বা কৃত্রিম রঙ মেশানো মিষ্টি কিডনিতে পাথর তৈরি করে এবং তাদের বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশে বাধা দেয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষক্রিয়াই একসময় শরীরের ভেতরে জমে দীর্ঘস্থায়ী রোগের রূপ নেয়।

সুপারিশ: বাংলাদেশে খাদ্য ভেজাল রোধে ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। প্রথমত, বিএসটিআই এবং বিএফএসএ-এর মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করে তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভেজালবিরোধী অভিযান শুধু সংখ্যায় বাড়ালেই হবে না, বরং তা হতে হবে আরও কার্যকর, ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে এবং অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তির বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যেখানে প্রয়োজনে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো শাস্তি কার্যকর করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর সঠিক বাস্তবায়ন এবং এই আইনে বর্ণিত খাদ্য আদালতগুলোকে আরও সক্রিয় করতে হবে। চতুর্থত, উৎপাদন পর্যায় থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিয়মিত ও নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করতে হবে এবং আধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধা ও পর্যাপ্ত জনবল দিয়ে পরীক্ষা প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে। পঞ্চমত, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং মৎস্য অধিদপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধন করে ভেজালের উৎসস্থলে আঘাত হানতে হবে। সবশেষে, জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রচার অভিযান চালাতে হবে, যাতে ভোক্তারা ভেজাল খাদ্য চিনতে পারে এবং নিরাপদ খাদ্য গ্রহণে উৎসাহিত হয়।


🔎 অনুসন্ধানে: ফারজানা আহমেদ

ফারজানা আহমেদ, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: খাদ্য ভেজাল ও বিএসটিআই (BSTI) ওয়াচ।

نظری یافت نشد


News Card Generator