শেয়ারবাজারের তারল্য সংকট: অপ্রচলিত বন্ড বাজারের উপেক্ষিত সম্ভাবনা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শেয়ারবাজারের তারল্য সংকট: অপ্রচলিত বন্ড বাজারের উপেক্ষিত সম্ভাবনা

তানভীর আহমেদ  avatar   
তানভীর আহমেদ
শেয়ারবাজারের তারল্য সংকট: অপ্রচলিত বন্ড বাজারের উপেক্ষিত সম্ভাবনা
শেয়ারবাজারের তারল্য সংকট: অপ্রচলিত বন্ড বাজারের উপেক্ষিত সম্ভাবনা
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স-এর ধারাবাহিক পতন এবং প্রায় প্রতিদিনই হাজার কোটি টাকার নিচে লেনদেন নেমে আসা দেশের পুঁজিবাজ...

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স-এর ধারাবাহিক পতন এবং প্রায় প্রতিদিনই হাজার কোটি টাকার নিচে লেনদেন নেমে আসা দেশের পুঁজিবাজারে তারল্য সংকটের একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। গত মে মাসে ডিএসইতে গড় লেনদেন ৫০০ কোটি টাকার নিচে নেমে আসে, যা বাজারের সার্বিক স্বাস্থ্য এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং বাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রচলিত শেয়ারবাজারের বাইরে অপ্রচলিত কিন্তু সম্ভাবনাময় খাতগুলোর দিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে, সুকুক ও কর্পোরেট বন্ডের মতো উদ্ভাবনী আর্থিক উপকরণগুলো কেবল তারল্য সরবরাহ বাড়াতে নয়, বরং বিনিয়োগের বহুমুখিতা নিশ্চিত করতেও এক বিশাল সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা এখনো বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে অনেকটাই উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক-নির্ভর অর্থায়ন এবং ইক্যুইটি-কেন্দ্রিক বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ। অথচ, উন্নত ও উদীয়মান বাজারগুলোতে কর্পোরেট বন্ড বাজার, বিশেষ করে সুকুকের মতো শরিয়াহ-সম্মত বন্ড, তারল্য সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বন্ড মার্কেটকে উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও, এর পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো অধরা। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালে বেক্সিমকো সুকুকের মাধ্যমে ৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল, যা ছিল দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো বেসরকারি খাতের সুকুক। এই সফল ইস্যু প্রমাণ করে যে, সঠিক কাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক পরিবেশ পেলে বিনিয়োগকারীরা অপ্রচলিত বন্ডে অর্থায়ন করতে আগ্রহী। তবে, এর পরেও কর্পোরেট বন্ডের সংখ্যা এবং লেনদেনের পরিমাণ খুবই সীমিত। ডিএসই ও সিএসই উভয় প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত বন্ডের সংখ্যা, বিশেষ করে কর্পোরেট বন্ডের, হাতে গোনা। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক বাজারের জটিল প্রক্রিয়া, সেকেন্ডারি মার্কেটে তারল্যের অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বন্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। একটি শক্তিশালী বন্ড বাজার গড়ে তুলতে হলে এই প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা অপরিহার্য। শুধু সরকারি বন্ডের উপর নির্ভর না করে, বেসরকারি কর্পোরেট বন্ডকে মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে।

অপ্রচলিত বন্ড বাজার, যেমন সুকুক এবং মিউনিসিপাল বন্ড, তারল্য সংকটের সমাধান হিসেবে একটি নতুন পথ খুলে দিতে পারে। সুকুক শুধুমাত্র ইসলামিক অর্থায়নের চাহিদা পূরণ করে না, বরং এটি একটি সম্পদ-ভিত্তিক বিনিয়োগ হওয়ায় ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকে, যা রক্ষণশীল বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারে। অন্যদিকে, মিউনিসিপাল বন্ড স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদী তহবিল সংগ্রহের সুযোগ দেয়, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক। বর্তমানে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) বন্ড লেনদেনের জন্য আধুনিক অবকাঠামো সরবরাহ করলেও, বাজার তৈরির মূল দায়িত্ব এখনো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বন্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা এবং কর প্রণোদনার অভাবও এই বাজারের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। যদি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন প্রকল্প অর্থায়নের জন্য ব্যাংক ঋণের পাশাপাশি বন্ড ইস্যু করার দিকে মনোযোগী হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এই বন্ডগুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, তাহলে পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদী তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। এটি কেবল শেয়ারবাজারের উপর চাপ কমাবে না, বরং বিনিয়োগের বহুমুখী সুযোগ তৈরি করে সামগ্রিক আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতা বাড়াবে।

বন্ডের প্রকার মোট ইস্যু পরিমাণ (২০২০-২০২৪) মোট তালিকাভুক্ত বন্ডের সংখ্যা (ডিএসই) গড় দৈনিক লেনদেন (২০২৪, কোটি টাকা)
সরকারি বন্ড ৳ ১,৫০,০০০ কোটি+ ৩০০+ ৪০-৫০
বেসরকারি কর্পোরেট বন্ড ৳ ৮,০০০ কোটি (আনুমানিক) ৩০-৩৫ ০.৫-১.৫
সুকুক (বেসরকারি) ৳ ৩,০০০ কোটি ১ ০.০৫-০.১০
মিউনিসিপাল বন্ড ৳ ০ ০ ০

উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সমন্বিতভাবে কর্পোরেট বন্ড এবং সুকুক ইস্যুর প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও দ্রুত করার জন্য একটি 'ফাস্ট ট্র্যাক' অনুমোদন পদ্ধতি চালু করুক। একইসাথে, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ড ইস্যু করতে উৎসাহিত করার জন্য কোম্পানি আইন ১৯৯৪ এবং সিকিউরিটিজ আইন ২০০০-এর অধীনে নির্দিষ্ট কর প্রণোদনা (যেমন: বন্ড থেকে প্রাপ্ত আয়ে হ্রাসকৃত কর্পোরেট কর) প্রদান করা হোক।
  • প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের, বিশেষ করে ব্যাংক, বীমা কোম্পানি এবং পেনশন তহবিলগুলোর জন্য কর্পোরেট বন্ডে বিনিয়োগের সীমা বৃদ্ধি এবং বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন: মোট পোর্টফোলিওর কমপক্ষে ৫%) অপ্রচলিত বন্ডে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (IDRA) নীতি প্রণয়ন করুক। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL) এবং দুই স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE ও CSE) সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেটে ইলেকট্রনিক ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারল্য বাড়াতে বাজার নির্মাতা (Market Maker) প্রথা চালু করুক।
  • স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা) অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য মিউনিসিপাল বন্ড ইস্যু করার অনুমতি প্রদান এবং এর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক প্রণয়ন করা হোক। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় এই ধরনের বন্ডের জন্য একটি ক্রেডিট গ্যারান্টি ফান্ড প্রতিষ্ঠা করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করুক।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানভীর আহমেদ

তানভীর আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator