সম্প্রতি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ১.২% শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান আমাদের উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণের আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তবতার মধ্যে এক সুস্পষ্ট ব্যবধান তুলে ধরে। যেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন দেখে, সেখানে এই সামান্য অনুপাত প্রশ্ন তোলে — কেন এই ব্যবধান? পশ্চিমা উচ্চশিক্ষার হাতছানি যেখানে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে প্রবেশের অন্যতম চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত, সেখানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি কতটা সক্ষম? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলেই বেরিয়ে আসে নানা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার চিত্র।
এই বাস্তবতার মূল গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির অভাব এবং তথ্যগত বিচ্যুতির পাশাপাশি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কিছু কাঠামোগত দুর্বলতাও এই ব্যবধানের জন্য দায়ী। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য কেবল ভালো একাডেমিক ফলাফলই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন হয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভাষা দক্ষতা পরীক্ষা (যেমন আইইএলটিএস, টোফেল) এবং গবেষণার পূর্ব অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত বাজেট জিডিপির ০.১%-এরও কম, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় নগণ্য। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীদের গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ বা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ও আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ সংক্রান্ত তথ্য প্রদানের জন্য সুসংগঠিত কোনো বিভাগ বা শক্তিশালী নেটওয়ার্কের অভাবও লক্ষণীয়। অনেক শিক্ষার্থী স্কলারশিপের সুযোগ সম্পর্কে অবগত নন অথবা আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনা পান না। এছাড়া, পশ্চিমা দেশগুলোর ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা, আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ এবং কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিরতাও শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে নিরুৎসাহিত করে। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সিলেবাস আধুনিক বিশ্বের চাহিদা পূরণে কতটা সক্ষম, সে প্রশ্নও এখানে প্রাসঙ্গিক। বহুক্ষেত্রে পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাদান পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, যা শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে।
তবে, এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিক দেখা যায়। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) সম্প্রতি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার উপর জোর দিয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে বিদেশে দক্ষতা-ভিত্তিক উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পে আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বিদেশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য একটি বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানি বা কানাডার মতো দেশগুলো কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি করছে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) বিষয়ক পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, যা পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্কলারশিপ পেতে সহায়ক। তবে, এই আগ্রহকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, ল্যাব সুবিধা এবং দক্ষ শিক্ষকের অভাব এখনও বড় বাধা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে অংশীদারিত্ব স্থাপন এবং স্কলারশিপের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করছে, কিন্তু এই প্রচেষ্টাগুলো এখনও ব্যাপক আকারে প্রভাব ফেলতে পারেনি। একইসাথে, পশ্চিমা দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মেধা ও পরিশ্রমী মনোভাবকে স্বীকৃতি দিলেও, প্রতিযোগিতামূলক স্কলারশিপের জন্য প্রয়োজনীয় সর্বাঙ্গীণ প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েই যাচ্ছে।
| বছর | বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদনকারী (আনুমানিক) | আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ প্রাপ্তির হার (%) | গবেষণা খাতে জিডিপি বরাদ্দ (%) | কারিগরি শিক্ষায় নথিভুক্ত শিক্ষার্থী (লক্ষ) |
|---|---|---|---|---|
| ২০২০ | ৮৫,০০০ | ০.৮% | ০.০৮% | ১৩.৪ |
| ২০২১ | ১,০৫,০০০ | ১.০% | ০.০৯% | ১৪.২ |
| ২০২২ | ১,৩০,০০০ | ১.২% | ০.১০% | ১৫.১ |
উৎস: UGC বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২২), BANBEIS শিক্ষা পরিসংখ্যান (২০২২), NSDA বার্ষিক রিপোর্ট (২০২২)
সুপারিশ
- শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অবিলম্বে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা সংস্কৃতি বিকাশে জিডিপির ন্যূনতম ০.৫% গবেষণা খাতে বরাদ্দ নিশ্চিত করার জন্য একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে, যেখানে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হবে এবং গবেষণা তহবিল বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
- জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর সাথে সমন্বয় করে একটি জাতীয় ভাষা দক্ষতা ও প্রবেশিকা পরীক্ষা প্রস্তুতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করবে, যা শিক্ষার্থীদের আইইএলটিএস, টোফেল, জিআরই, জিএমএটি-এর মতো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগুলোতে ভর্তুকি মূল্যে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পশ্চিমা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন প্রক্রিয়া, ভিসা নির্দেশিকা ও স্কলারশিপের সুযোগ সম্পর্কে নিয়মিত কর্মশালা ও কাউন্সেলিং সেবা প্রদান করবে।
- শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে 'আন্তর্জাতিক ছাত্র সহায়তা ও স্কলারশিপ অফিস' (International Student Support & Scholarship Office) প্রতিষ্ঠা বাধ্যতামূলক করবে, যেখানে কমপক্ষে দুইজন পূর্ণকালীন প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা থাকবেন, যাদের কাজ হবে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সমঝোতা স্মারক (MoU) স্থাপন করা, শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপের তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার করা এবং আবেদন প্রক্রিয়ায় সরাসরি সহায়তা প্রদান করা; এই অফিসগুলোর কার্যক্রম নিয়মিতভাবে ইউজিসি দ্বারা নিরীক্ষিত হবে।