স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় ব্যাপক… | আই নিউজ বিডি

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম

রেহনুমা তাবাসসুম  avatar   
রেহনুমা তাবাসসুম
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত, যা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সাথে জড়িত, তা দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির এক নীরব মহামারিতে আক্রান্ত। কেনাকাটা, নিয়োগ, বদলি, পদোন্ন...

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত, যা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সাথে জড়িত, তা দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির এক নীরব মহামারিতে আক্রান্ত। কেনাকাটা, নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং সেবা প্রদান—প্রায় প্রতিটি স্তরেই দুর্নীতির বিষাক্ত ছোবল দেখা যায়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির ১১টি প্রধান উৎস চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে ক্রয় ও সংগ্রহে ব্যাপক অনিয়ম অন্যতম। এই অনিয়মগুলো কেবল আর্থিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতেও বড় বাধা সৃষ্টি করছে।

চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় দুর্নীতির চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কোভিড-১৯ অতিমারীর সময় নিম্নমানের মাস্ক ও পিপিই কেলেঙ্কারি, হাসপাতালের পর্দা বা বই কেনার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক মূল্য দেখানো এবং কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কিনে তা ব্যবহার না করে ফেলে রাখার মতো ঘটনা প্রায়ই সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও কম্পিউটার কেনাকাটায় বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যেখানে টেন্ডার অনুযায়ী এইচপি ব্র্যান্ডের ১২তম জেনারেশনের ২০০টি ডেস্কটপ কম্পিউটার কেনার কথা থাকলেও সরবরাহ করা হয়েছে পুরনো ও ব্র্যান্ডবিহীন কম্পিউটার, যা সরকারের প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি করেছে। একইসাথে ৬ হাজার জিপিডি ক্ষমতাসম্পন্ন পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রের বদলে মাত্র ১২০০ জিপিডি'র একটি ইউনিট সরবরাহ করা হয়েছে, যা এখনও স্থাপন করা হয়নি। ঢাকা শহরের সরকারি হাসপাতালগুলোতে কোভিড-১৯ মহামারীর প্রথম চার মাসে অস্বাভাবিক দামে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার কারণে প্রায় ২৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, কুয়েত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল প্রতিটি ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকায় ইসিজি মেশিন কিনেছিল, যার বাজারমূল্য ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত নিজেও স্বীকার করেছেন যে, গত ১৫ বছর ধরে হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ক্রয়ে দুর্নীতি ও অপচয় হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক সরঞ্জাম অকেজো পড়ে আছে।

ওষুধ কেনাকাটা এবং এর প্রশাসনেও দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার লক্ষ্যণীয়। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪ কোটি টাকার ওষুধ কেনাকাটায় ৪ কোটি টাকার বেশি লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে হাসপাতালের পরিচালকসহ একটি সিন্ডিকেট জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বিরুদ্ধেও পদে পদে ঘুষ লেনদেন এবং অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় এই অধিদপ্তরের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের চিত্র উঠে এসেছে। দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধানে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. ইয়াহ্ইয়ার পরিবারও জড়িত বলে জানা গেছে। ভেজাল ও নকল ওষুধের বাণিজ্যও স্বাস্থ্য খাতের একটি বড় সমস্যা, যা সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করছে। এমনকি কিছু বৈধ কারখানায়ও নকল ওষুধ তৈরি হচ্ছে এবং মুনাফালোভী চক্রের মাধ্যমে তা প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।

স্বাস্থ্য খাতের এই দুর্নীতির পেছনে রয়েছে জবাবদিহিতার অভাব এবং কাঠামোগত দুর্বলতা। যখন অনিয়মের জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না বা শাস্তি হয় না, তখন দুর্নীতিবাজরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের অর্থ অব্যয়িত থাকা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার কম হওয়াও একটি বড় সমস্যা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে প্রকল্পগুলোর গড় বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৫.০৬ শতাংশ, যা দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাবকেই নির্দেশ করে। এছাড়া, হাসপাতালে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতির সিদ্ধান্ত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবকেই প্রকাশ করে বলে টিআইবি মন্তব্য করেছে। সম্প্রতি ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে হামের টিকার সংকটের কারণে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনাও স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা ও ক্রয় প্রক্রিয়ার দুর্বলতাকে প্রকটভাবে তুলে ধরেছে।

এই ব্যাপক দুর্নীতির ফলে দেশের সাধারণ মানুষ ন্যায্য স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। যদিও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন স্বীকার করেছেন যে, বিগত অপশাসনের কারণে দেশের স্বাস্থ্য খাত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি স্বাস্থ্য খাতের গোটা পদ্ধতি পরিবর্তন করে একটি নতুন শৃঙ্খলার মধ্যে আনার কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (১৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী) ঘোষণা করেছেন যে, সরকার এমন একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর যেখানে চিকিৎসার জন্য কাউকে বিদেশে যেতে হবে না এবং অর্থের অভাবে কেউ বঞ্চিত হবে না। তবে, এই প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য প্রয়োজন আরও কঠোর পদক্ষেপ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।

সুপারিশ: স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি দমনে নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি: প্রথমত, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে এবং ই-প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্রয়কৃত সরঞ্জামের মান যাচাই ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন নিরীক্ষা কমিটি গঠন করা উচিত, যারা নিয়মিতভাবে হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করবে। তৃতীয়ত, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ স্বাস্থ্য খাতের সকল নিয়ন্ত্রক সংস্থায় অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং নকল ও ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। চতুর্থত, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং এক্ষেত্রে যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পঞ্চমত, স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং অব্যয়িত অর্থ থাকার কারণগুলো নিরূপণ করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সর্বশেষে, দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি তদন্তে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে এবং তাদের সুপারিশমালা বাস্তবায়নে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

📎 এই প্রতিবেদনের তথ্যপ্রমাণ

গুগল সার্চের মাধ্যমে এই প্রতিবেদনের গবেষণায় ব্যবহৃত প্রকৃত সোর্স:


🔎 অনুসন্ধানে: রেহনুমা তাবাসসুম

রেহনুমা তাবাসসুম, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: স্বাস্থ্য খাত, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটা।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator