পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনার আড়ালে দুর্নীতির কালো ছায়া | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনার আড়ালে দুর্নীতির কালো ছায়া

তৌসিফ রহমান  avatar   
তৌসিফ রহমান
পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনার আড়ালে দুর্নীতির কালো ছায়া
পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনার আড়ালে দুর্নীতির কালো ছায়া
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাত অপার সম্ভাবনাময় হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এর ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য,...

বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাত অপার সম্ভাবনাময় হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এর ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে এ দেশ পর্যটকদের জন্য এক আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে, কিন্তু স্থানীয় সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ভাড়া, পর্যটকদের হয়রানি, ভূমি দখল এবং প্রত্নসম্পদ চুরি ও পাচারের মতো ঘটনাগুলো এই সম্ভাবনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের বিভিন্ন মহাপরিকল্পনা এবং উদ্যোগের পরও এ খাতের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না, বরং নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ বারবার সামনে আসছে।

প্রত্নতত্ত্ব খাতে চুরি ও পাচার একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মূল্যবান কালোপাথরের মূর্তি, প্রাচীন মুদ্রা, শিলালিপি, স্থাপনার অংশবিশেষ, পুঁথি, তৈজসপত্র ও অলংকারসহ অসংখ্য প্রত্নসম্পদ প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে, যা একটি বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ধনী ব্যক্তিরা এসব সম্পদ আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে সংগ্রহ করছেন। অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্র থেকেও নিদর্শন চুরি হয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে। মহাস্থানগড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থান থেকে প্রাপ্ত অনেক মুদ্রা এখন ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে যাওয়ায় গবেষণা ব্যাহত হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে অ্যান্টিক শপের আড়ালে প্রত্নসম্পদ পাচারকারীদের ধরা পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। ২০২২ সালে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পাচারের সময় ৩১টি মূল্যবান কালোপাথরের মূর্তি উদ্ধার করেছে। প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণ আইন ১৯৬৮ (১৯৭৬ সালে সংশোধিত) অত্যন্ত পুরনো ও অকার্যকর, যেখানে পাচার ও কেনা-বেচার শাস্তি মাত্র ৩০ দিনের কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা জরিমানা। এই দুর্বল আইনের সুযোগ নিয়ে অনেক অমূল্য প্রত্নসম্পদ হারিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি, একটি নতুন খসড়া আইনে প্রত্নসম্পদের ক্ষতিসাধন বা ধ্বংসের জন্য ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালকদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যেখানে রাজনৈতিক সখ্যতার মাধ্যমে নতুন প্রকল্প অনুমোদন এবং একটি জাদুঘর ছয় বছর ধরে উদ্বোধনের অপেক্ষায় পড়ে থাকার মতো ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রত্নসম্পদ চুরি ও পাচারের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে ।

পর্যটন খাতেও অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র হতাশাজনক। দেশের ১ হাজার ৫৩৮টি পর্যটন স্পট থাকা সত্ত্বেও সিন্ডিকেট ও হয়রানির কারণে পর্যটকরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সিলেট, কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি—এসব জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে স্থানীয় সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং পর্যটকদের হয়রানি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্টে ১০ একর সরকারি খাসজমি প্রভাবশালী মহলের দ্বারা অবৈধভাবে দখল হওয়ার মতো গুরুতর ঘটনা ঘটেছে, যেখানে টিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে জমি ঘেরাও করা হয়েছে। ২০০৩ সালে সৈকত সংলগ্ন ১৩০ একর জমিতে হোটেল-মোটেল জোন গড়ে তোলার পর ৮৭টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও, শর্ত অনুযায়ী নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় ২০১০ সালে ৫৯টি প্লটের ইজারা বাতিল করা হয়। ২০১৮ সালে এসব জমি সরকারি খাস খতিয়ানে লিপিবদ্ধ হলেও, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে পুনরায় দখলের চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের (বিপিসি) অধীন ৫১টি হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁর মধ্যে ৩৫টি পরিচালিত হলেও আধুনিকতার অভাব, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং পেশাদারিত্বের অভাবে সেগুলো ক্রমাগত লোকসানে চলছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে প্রতি বছর গড়ে ১০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে বিপিসিকে। এমনকি সিলেটের পর্যটন মোটেল ও কক্সবাজারের মোটেল লাবণী, উপল, প্রবাল ও হোটেল শৈবালও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আয় করতে পারছে না।

পর্যটন খাতের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও ধীরগতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সমন্বয়হীনতা প্রকট। সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ অনেক প্রকল্পেই পুরোপুরি ব্যয় হচ্ছে না, যার ফলে প্রতি বছরই একটি বড় অংশ ফেরত আসছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে ৪৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপ পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পেলেও গত অর্ধযুগে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি ব্রিজের অ্যাপ্রোচ ও গাইডওয়াল উদ্বোধনের আগেই ধসে পড়েছে, যেখানে অনিয়ম ও তদারকির অভাবের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া, বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পে ৮১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চারটি মামলা দায়ের করেছে, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টাসহ ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। চট্টগ্রামের 'মিনি বাংলাদেশ' প্রকল্পটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, যা দুর্নীতি ও অপচয়ের এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২২ সালের 'ভ্রমণ ও পর্যটন উন্নয়ন সূচক' অনুযায়ী, বিশ্বের ১১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এটি দেশের পর্যটন খাতের সামগ্রিক দুর্বলতাকেই তুলে ধরে।

এই পরিস্থিতি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করছে। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশকে এখনো দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ হিসেবেই বেশি দেখা হয়, পর্যটন গন্তব্য হিসেবে নয়। সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং মন্ত্রী আফরোজা খানম পর্যটন খাতকে 'ট্যুরিজম হাব' হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতা দূর করার উদ্যোগের কথা বলেছেন। জাতীয় পর্যটন নীতিমালা-২০২৬ প্রণয়নের কাজ চলছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা তৈরির কথাও বলা হয়েছে। তবে, এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো অধরা।

সুপারিশ: বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। এই টাস্কফোর্সকে প্রত্নসম্পদ চুরি ও পাচার রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, পর্যটন স্পটগুলোতে সিন্ডিকেট ও হয়রানি বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, এবং সরকারি পর্যটন প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি, কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকায় ভূমি দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দখলকৃত জমি পুনরুদ্ধার করে পর্যটন উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের হোটেল-মোটেলগুলোর আধুনিকায়ন ও সেবার মান উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্বকে উৎসাহিত করতে হবে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনতে হবে। সর্বসাধারণের মধ্যে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ ও পর্যটন সচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক প্রচার অভিযান চালানোও জরুরি।


🔎 অনুসন্ধানে: তৌসিফ রহমান

তৌসিফ রহমান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator