সম্প্রতি, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রস্তাবনা ২৭০৯ (UNSC Resolution 2709) বৈশ্বিক সাইবার পরিসরে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের বিষয়ে একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই প্রস্তাবনা এমন এক সময়ে এসেছে যখন বাংলাদেশ ডেটা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আন্তর্জাতিক সাইবার কূটনীতির ময়দানে এক জটিল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বিশেষত, প্রতিবেশী দেশগুলোতে সাইবার হামলার ক্রমবর্ধমান ঘটনা এবং আঞ্চলিক ডেটা বিনিময় চুক্তির অনুপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য এক নতুন মাত্রার নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে, যার ফলস্বরূপ ডেটা উৎপাদন ও ব্যবহারের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ডেটা, যা দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের মেরুদণ্ড, প্রায়শই আন্তর্জাতিক ক্লাউড সার্ভার এবং বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। ফলে, যখন ডেটা দেশের ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে যায়, তখন এর ওপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এক কঠিন কূটনৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, বিদেশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অ্যাপস ব্যবহারকারীদের ডেটা সংগ্রহ করে তাদের নিজ দেশের এখতিয়ারে রাখলে, তা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও নাগরিকদের গোপনীয়তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করে। এই পরিস্থিতিতে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সাইবার কূটনীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ডেটা প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদনে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। ডেটা স্থানীয়করণ (data localization) এবং ডেটা সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের জোরালো অবস্থান গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।
আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাগুলো যেমন BIMSTEC এবং SAARC-এর মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিন্ন নীতি ও প্রোটোকল তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার। যদিও SAARC সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু আলোচনা শুরু করেছিল, রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এর অগ্রগতি মন্থর। অন্যদিকে, BIMSTEC সাইবার অপরাধ দমনের জন্য একটি আইনি কাঠামোর বিষয়ে আলোচনা শুরু করলেও, ডেটা সার্বভৌমত্বের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সুস্পষ্ট চুক্তি এখনও অনুপস্থিত। UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিশ্বব্যাপী সাইবার হুমকি মোকাবেলায় সক্ষমতা বাড়ানোর একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে, যেখানে বাংলাদেশ তার সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সাইবার সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করে বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোতে অবদান রাখতে পারে। ডেটা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আন্তর্জাতিক নীতি ও মানদণ্ড প্রণয়নে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। বিশেষত, ডেটা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বলতা এবং উন্নত দেশগুলোর প্রযুক্তিগত আধিপত্য একটি অসম ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যেখানে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার্থে বলিষ্ঠ কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
| সূচক | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ |
|---|---|---|---|
| বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান (স্থান) | ৭৩ | ৫৩ | ৬৮ |
| ডেটা লঙ্ঘন (Data Breach) এর ঘটনা (প্রতি মিলিয়ন ব্যবহারকারী) | ৩.৫ | ৪.২ | ৫.১ |
| আন্তর্জাতিক ডেটা স্থানান্তর সংক্রান্ত আইনি ব্যবস্থার স্কোর (০-৫, ৫ সর্বোচ্চ) | ১.৫ | ১.৮ | ২.০ |
| জাতিসংঘে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রস্তাবনায় বাংলাদেশের সমর্থন (%) | ৮৫ | ৯২ | ৯৪ |
উৎস: ITU Global Cybersecurity Index, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও জাতিসংঘ আর্কাইভ।
সুপারিশ
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ডেটা সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় সাইবার কূটনীতি নীতিমালা' প্রণয়ন করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং বহুপাক্ষিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুসংহত করবে।
- BIMSTEC এবং SAARC-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে 'আঞ্চলিক ডেটা সুরক্ষা প্রোটোকল' বাস্তবায়নে বাংলাদেশ নেতৃত্ব দেবে, যেখানে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ডেটা স্থানীয়করণ এবং ডেটা বিনিময়ের জন্য একটি অভিন্ন আইনি কাঠামো তৈরি হবে।
- জাতিসংঘের সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্যোগসমূহে (যেমন, UN Group of Governmental Experts, Open-Ended Working Group) বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং UN Peacekeeping মিশনে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি ও প্রশিক্ষণ বাড়ানোর জন্য 'বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (BIISS)' এর মাধ্যমে গবেষণা ও প্রস্তাবনা তৈরি করতে হবে।