বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের মানসিক প্রস্তুতি: পারফরম্যান্সের অদৃশ্য শক্তি ও উপেক্ষিত চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের মানসিক প্রস্তুতি: পারফরম্যান্সের অদৃশ্য শক্তি ও উপেক্ষিত চ্যালেঞ্জ

ড. আসিফ রায়হান  avatar   
ড. আসিফ রায়হান
বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের মানসিক প্রস্তুতি: পারফরম্যান্সের অদৃশ্য শক্তি ও উপেক্ষিত চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের মানসিক প্রস্তুতি: পারফরম্যান্সের অদৃশ্য শক্তি ও উপেক্ষিত চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) কর্তৃক ঘোষিত প্যারিস অলিম্পিক ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রস্তুতি কর্মসূচিতে অ্যাথলেটদের শারীরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) কর্তৃক ঘোষিত প্যারিস অলিম্পিক ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রস্তুতি কর্মসূচিতে অ্যাথলেটদের শারীরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য ও পারফরম্যান্স সাইকোলজির অন্তর্ভুক্তির অনুপস্থিতি একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। যদিও বিওএ প্রায়শই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পদক অর্জনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে, কিন্তু উচ্চ-পারফরম্যান্স ক্রীড়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত মানসিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ও সুনির্দিষ্ট কৌশলের অভাব বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘদিনের উপেক্ষিত একটি চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে যেখানে মানসিক শক্তিকে 'অদৃশ্য শক্তি' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, সেখানে আমাদের অ্যাথলেটরা প্রায়শই কেবল শারীরিক ও কৌশলগত প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভর করে প্রতিযোগিতার ময়দানে নামেন, যা তাদের পূর্ণ সম্ভাবনার বিকাশে অন্তরায় সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের ক্রীড়া কাঠামোতে, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় স্তর পর্যন্ত, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং স্পোর্টস সাইকোলজিস্টের ভূমিকা এখনো অনানুষ্ঠানিক বা সীমিত পরিসরে বিদ্যমান। ন্যাশনাল স্পোর্টস কাউন্সিল (এনএসসি) এর অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনগুলির বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শারীরিক ফিটনেস, পুষ্টি এবং কৌশলগত প্রশিক্ষণে বরাদ্দ থাকলেও মানসিক প্রস্তুতির জন্য পৃথক বাজেট বা বিশেষজ্ঞ নিয়োগের দৃষ্টান্ত বিরল। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি'র খসড়ায় অ্যাথলেটদের সামগ্রিক বিকাশের কথা বলা হলেও, মানসিক প্রস্তুতির জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল বা তহবিল বরাদ্দের বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা অনুপস্থিত। এর ফলে, বড় প্রতিযোগিতার চাপ, ইনজুরির ভয়, পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং গণমাধ্যমের অতিরিক্ত মনোযোগের মতো বিষয়গুলো মোকাবেলায় অ্যাথলেটরা প্রায়শই অপ্রস্তুত থাকেন। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এর 'স্পোর্টস ফর ডেভেলপমেন্ট' সংক্রান্ত গবেষণা পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মনোযোগ দিলে অ্যাথলেটদের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিকটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে একজন অ্যাথলেটের মানসিক সুস্থতা প্রায়শই তার ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার বিষয় হিসেবে নয়।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত 'স্পোর্টস ইনোভেশন অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ইন সাউথ এশিয়া' শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্রীড়া খাতের উন্নয়নে প্রযুক্তিগত সংযোজন এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞান কেবল শারীরিক সক্ষমতা পরিমাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি অ্যাথলেটদের মানসিক দৃঢ়তা, চাপ মোকাবেলা করার ক্ষমতা এবং লক্ষ্য নির্ধারণের কৌশল শেখানোর ওপরও জোর দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে স্পোর্টস সাইকোলজিকে এখনো একটি 'অতিরিক্ত' বা 'ঐচ্ছিক' বিষয় হিসেবে দেখা হয়, যা মূলধারার প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে স্থান পায় না। বিদেশি লিগ বা আন্তর্জাতিক মানের ক্লাবগুলিতে খেলা বাংলাদেশের হাতেগোনা কিছু অ্যাথলেট ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা তাদের ক্লাব/ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পেয়ে থাকলেও, জাতীয় দলের অধিকাংশ অ্যাথলেট এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ক্রীড়া উন্নয়নে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য বাজেট বরাদ্দ করা হলেও, এই বরাদ্দের একটি ক্ষুদ্র অংশও স্পোর্টস সাইকোলজি বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় হয় না। ফলস্বরূপ, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অ্যাথলেটদের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতার অভাব, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি এবং অপ্রত্যাশিত ভুল দেখা যায়, যা প্রায়শই তাদের শারীরিক সক্ষমতা বা কৌশলগত ত্রুটির চেয়ে মানসিক চাপ বা উদ্বেগের ফল। এই অপ্রতুলতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আন্তর্জাতিক সাফল্য অর্জনের পথে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

বছর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বাজেট (কোটি টাকা) মানসিক স্বাস্থ্য ও স্পোর্টস সাইকোলজিতে বরাদ্দ (আনুমানিক %) আন্তর্জাতিক পদক প্রাপ্তি (উল্লেখযোগ্য ইভেন্টে)
২০২০-২১ ১০৯৪ <০.১% ১০
২০২১-২২ ১১০৯ <০.১% ১২
২০২২-২৩ ১১৯৪ <০.১% ৯
২০২৩-২৪ ১৩২৫ <০.১% ১৪

উৎস: বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট নথি এবং বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) এর বার্ষিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি' (২০১৯) সংশোধন করে একটি সুনির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ যোগ করতে হবে, যেখানে অ্যাথলেটদের মানসিক প্রস্তুতি ও পারফরম্যান্স সাইকোলজির জন্য বার্ষিক বাজেটে ন্যূনতম ১% বরাদ্দ রাখা এবং প্রতিটি জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনে অন্তত একজন পূর্ণকালীন স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) এর যৌথ উদ্যোগে একটি 'ন্যাশনাল সেন্টার ফর স্পোর্টস সাইকোলজি' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেটদের জন্য কাউন্সেলিং, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট এবং পারফরম্যান্স এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম সরবরাহ করবে এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এর সহায়তায় আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে।
  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) এর অধীনে পরিচালিত সকল ক্রীড়া প্রশিক্ষণ একাডেমির পাঠ্যক্রমে 'স্পোর্টস সাইকোলজি'কে একটি বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং ক্রীড়া বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে স্পোর্টস সাইকোলজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালু করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) নির্দেশনা প্রদান করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. আসিফ রায়হান

ড. আসিফ রায়হান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator