এআই বনাম সত্য: মিসইনফরমেশন মোকাবিলায় ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের নতুন চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এআই বনাম সত্য: মিসইনফরমেশন মোকাবিলায় ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের নতুন চ্যালেঞ্জ

তানজিনা ইয়াসমিন  avatar   
তানজিনা ইয়াসমিন
এআই বনাম সত্য: মিসইনফরমেশন মোকাবিলায় ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের নতুন চ্যালেঞ্জ
এআই বনাম সত্য: মিসইনফরমেশন মোকাবিলায় ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের নতুন চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
গত মার্চ মাসে ফেসবুকের মূল সংস্থা মেটা (Meta) তাদের প্রকাশিত এক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৩ সালের শেষ তিন মাসে তারা বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন ভুয়া অ...

গত মার্চ মাসে ফেসবুকের মূল সংস্থা মেটা (Meta) তাদের প্রকাশিত এক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৩ সালের শেষ তিন মাসে তারা বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন ভুয়া অ্যাকাউন্ট শনাক্ত ও অপসারণ করেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অ্যাকাউন্ট এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট ব্যবহার করে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছিল। এই ঘটনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের মুখে ভুল তথ্য (মিসইনফরমেশন) এবং অপতথ্য (ডিসইনফরমেশন) মোকাবিলায় ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের পুরোনো পদ্ধতিগুলোর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে তুলেছে। যখন এআই দিয়ে তৈরি টেক্সট, অডিও, ভিডিও এবং ইমেজ এতোটাই বাস্তবসম্মত হয়ে উঠছে যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা যাচাই করা কঠিন, তখন শুধু প্রযুক্তিগত সমাধানই নয়, বরং আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর যুগোপযোগী পরিবর্তনও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

এআই-এর মাধ্যমে তৈরি ‘ডিপফেক’ ভিডিও বা অডিও ক্লিপগুলো এখন কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়, বরং জনমত প্রভাবিত করা, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা এবং সামাজিক বিভেদ উসকে দেওয়ার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পূর্বে ভুল তথ্যের প্রধান উৎস ছিল অসচেতন ব্যবহারকারী বা সুসংগঠিত কিছু প্রচার চক্র। কিন্তু এখন জেনারেটিভ এআই মডেলগুলো সেকেন্ডের মধ্যে হাজার হাজার সুসংগঠিত, বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রেক্ষাপট-ভিত্তিক ভুল তথ্য তৈরি করতে সক্ষম। এই নতুন বাস্তবতায়, প্রথাগত ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলো, যারা সাধারণত মানুষের তৈরি কনটেন্টের সত্যতা যাচাই করে, তারা এআই-জেনারেটেড তথ্যের বিশাল প্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগে এআই-জেনারেটেড কিছু অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়, যা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিকৃত বক্তব্য ধারণ করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, কেবল ম্যানুয়াল যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অসম্ভব। World Bank এর এক গবেষণা অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডিজিটাল বিভাজন এবং সাক্ষরতার অভাবে এআই-ভিত্তিক ভুল তথ্য আরও দ্রুত ছড়াতে পারে, যা সামাজিক সংহতি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য হুমকিস্বরূপ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, দ্রুত বর্ধনশীল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক প্রসারের কারণে এআই-ভিত্তিক ভুল তথ্যের ঝুঁকি আরও প্রকট। স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাকে লক্ষ্য করে এআই মডেলগুলো সহজেই ভুয়া খবর তৈরি করতে পারে, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে বা গুজব ছড়িয়ে জনজীবনে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইন) প্রণয়নের মাধ্যমে অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, কিন্তু এআই-জেনারেটেড ডিপফেক বা সিনথেটিক মিডিয়াকে সুনির্দিষ্টভাবে মোকাবিলা করার জন্য বিদ্যমান আইনে পর্যাপ্ত বিধান নেই। এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ভুল তথ্য ছড়ানো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে শনাক্ত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে, কারণ অনেক সময় এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের পরিচয় গোপন রাখতে সহায়তা করে। ADB (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এআই-এর অপব্যবহার রোধে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জনসচেতনতার অভাব একটি বড় উদ্বেগের কারণ।

বছর এআই-জেনারেটেড মিসইনফরমেশন সংক্রান্ত রিপোর্ট (বৈশ্বিক) ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার সংখ্যা (বাংলাদেশ) অনলাইন গুজব শনাক্তকরণ হার (ম্যানুয়াল)
২০২০ ৫০০+ ২ ৩৫%
২০২১ ১,২০০+ ৩ ৩২%
২০২২ ৩,০০০+ ৪ ২৮%
২০২৩ ১০,০০০+ ৫ ২২%
২০২৪ (প্রক্ষেপিত) ২৫,০০০+ ৬ ১৫%

উৎস: Meta, World Bank, ADB এবং স্থানীয় ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রতিবেদন

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে একটি 'এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট শনাক্তকরণ ও যাচাইকরণ নীতিমালা' প্রণয়ন করতে হবে। এই নীতিমালায় ডিপফেক এবং সিনথেটিক মিডিয়া শনাক্তকরণের জন্য উন্নত এআই টুলস ব্যবহার এবং দ্রুত অপসারণের জন্য প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে বাধ্যতামূলক সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) মাধ্যমে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে 'ডিজিটাল লিটারেসি এবং মিডিয়া সাক্ষরতা' কোর্স চালু করতে হবে, যেখানে এআই-জেনারেটেড ভুল তথ্য শনাক্তকরণের মৌলিক কৌশল ও এর সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা হবে।
  • বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে দেশের ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলোর জন্য এআই-ভিত্তিক টুলস এবং ডেটাবেস তৈরির জন্য বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করতে হবে, যাতে তারা দ্রুত এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানজিনা ইয়াসমিন

তানজিনা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মিসইনফরমেশন ও ফ্যাক্ট-চেকিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator