মানি লন্ডারিং ও হুন্ডি প্রতিরোধ: ডিজিটাল হুন্ডির নতুন কৌশল ও অর্থনীতির অদেখা ক্ষত | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মানি লন্ডারিং ও হুন্ডি প্রতিরোধ: ডিজিটাল হুন্ডির নতুন কৌশল ও অর্থনীতির অদেখা ক্ষত

আনোয়ার পারভেজ  avatar   
আনোয়ার পারভেজ
মানি লন্ডারিং ও হুন্ডি প্রতিরোধ: ডিজিটাল হুন্ডির নতুন কৌশল ও অর্থনীতির অদেখা ক্ষত
মানি লন্ডারিং ও হুন্ডি প্রতিরোধ: ডিজিটাল হুন্ডির নতুন কৌশল ও অর্থনীতির অদেখা ক্ষত
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) কর্তৃক প্রকাশিত একটি বার্ষিক প্রতিবেদনে ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) কর্তৃক প্রকাশিত একটি বার্ষিক প্রতিবেদনে ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ৭.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ অবৈধ পথে পাচার হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ দেশের অর্থনীতিতে যে অদেখা ক্ষত তৈরি করছে, তা কেবল রেমিটেন্স প্রবাহকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে, মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো হুন্ডি কার্যক্রমের জন্য নতুন কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা সনাতন হুন্ডির চেয়েও দ্রুত ও সহজে অর্থ স্থানান্তরে সহায়তা করছে। এই পরিস্থিতি প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

ডিজিটাল হুন্ডির এই বিস্তার শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফল নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং স্থানীয় কিছু অসৎ চক্রের যোগসাজশ। পূর্বে যেখানে হুন্ডি মূলত নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে এখন অনলাইন গেমিং, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে অবৈধ লেনদেন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির ছদ্মবেশে অর্থ পাচার হচ্ছে। World Bank-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের প্রসারের সাথে সাথে অর্থ পাচারের নতুন উপায়ও তৈরি হচ্ছে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় নজরদারি আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, প্রবাসী আয় প্রেরণে ব্যাংক চ্যানেলের উচ্চ চার্জ, সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া এবং বিনিময় হারের অসামঞ্জস্য অনেক প্রবাসীকে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করছে। এই ডিজিটাল হুন্ডি চক্রগুলো সাধারণত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য তাদের শনাক্তকরণ ও ট্র্যাকিংয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে। এর ফলে, দেশের বৈধ আর্থিক চ্যানেলগুলো একদিকে যেমন তাদের কার্যকারিতা হারাচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে অবৈধ অর্থের প্রবাহ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তারা নিজেদের অবৈধ মুনাফা বাড়াচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতিতে ইন্ধন জোগাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করছে।

ডিজিটাল হুন্ডি এবং মানি লন্ডারিংয়ের এই নবতর কৌশল বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য এক গভীর সংকট তৈরি করেছে। এর ফলে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তা সম্প্রতি ADB কর্তৃক প্রকাশিত 'এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক' প্রতিবেদনেও পরিলক্ষিত হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অবৈধ অর্থ পাচার উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ডিজিটাল হুন্ডি রেমিটেন্সের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে আনুষ্ঠানিক চ্যানেল থেকে বিচ্যুত করছে, যার ফলে সরকার বৈধ পথে বৈদেশিক মুদ্রা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই অর্থ প্রায়শই দেশের অভ্যন্তরে মাদক ব্যবসা, অস্ত্র চোরাচালান, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং অন্যান্য অবৈধ কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়, যা সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি। অর্থ পাচারকারীরা বিভিন্ন জটিল লেনদেন কাঠামো এবং অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে তাদের অবৈধ অর্থকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে, যা দেশের কর ব্যবস্থাকেও ফাঁকি দেয়। এর ফলস্বরূপ, সরকার রাজস্ব হারায় এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্ত হয়। আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে বিনিয়োগকারীরাও নিরুৎসাহিত হন, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই অদেখা ক্ষত দেশের অর্থনীতিকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে, যা দৃশ্যমান না হলেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং ধ্বংসাত্মক।

বছর অবৈধ পথে পাচারকৃত অর্থের আনুমানিক পরিমাণ (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বৈধ চ্যানেলে রেমিটেন্স প্রবাহ (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (বিলিয়ন মার্কিন ডলার, জুন মাসের শেষে)
২০২০-২১ ৬.৫ ২৪.৭৭ ৪৬.৩৯
২০২১-২২ ৭.২ ২১.০৩ ৪১.৮২
২০২২-২৩ ৭.৮ ২১.৬১ ৩০.১৮

উৎস: বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) বার্ষিক প্রতিবেদন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও World Bank ডাটা।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) কর্তৃক মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের ওপর কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে এবং 'মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২' এর অধীনে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ ও তদন্তের জন্য একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করতে হবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স প্রেরণের চার্জ কমানো, দ্রুত অর্থ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারকে বাজারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য 'বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭' এর আওতায় নতুন নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮' এর ধারা সম্প্রসারিত করে ডিজিটাল হুন্ডি ও অর্থ পাচারে ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের, যেমন World Bank ও ADB-এর সহযোগিতায়, একটি আন্তঃদেশীয় সাইবার ক্রাইম মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণ সেল গঠন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আনোয়ার পারভেজ

আনোয়ার পারভেজ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানি লন্ডারিং ও হুন্ডি প্রতিরোধ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator