খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার আইন: প্রভাবশালী মহলের ছায়া ও আইনের ফাঁকফোকর | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার আইন: প্রভাবশালী মহলের ছায়া ও আইনের ফাঁকফোকর

অ্যাডভোকেট সাব্বির  avatar   
অ্যাডভোকেট সাব্বির
খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার আইন: প্রভাবশালী মহলের ছায়া ও আইনের ফাঁকফোকর
খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার আইন: প্রভাবশালী মহলের ছায়া ও আইনের ফাঁকফোকর
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, যা মো...

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯.৬৭ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যেখানে ঋণ পুনরুদ্ধারের বিদ্যমান আইনগুলো প্রভাবশালী মহলের ছায়া এবং সুকৌশলী ফাঁকফোকরের কারণে প্রায়শই অকার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। বিশেষ করে, সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় অনেক বেশি, যা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রধান হাতিয়ার হলো অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩। এই আইনটি ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার জন্য প্রণীত হলেও, বাস্তবে এর প্রয়োগে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়। প্রভাবশালী ঋণখেলাপিরা তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতা ব্যবহার করে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করেন, যা ব্যাংকগুলোকে ঋণ আদায়ে নিরুৎসাহিত করে। এমনকি, উচ্চ আদালতে রিট করে অর্থঋণ আদালতের আদেশ স্থগিত করিয়ে নেওয়া এক সাধারণ প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। এছাড়া, জামানতের সঠিক মূল্যায়ন না করা, ভুয়া জামানত দেখিয়ে ঋণ নেওয়া এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে ঋণ অনুমোদন পাওয়ার ঘটনা প্রায়শই ঘটে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (BIBM)-এর একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক প্রভাব ঋণ বিতরণের মান এবং পরবর্তীতে ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মানকে হ্রাস করে।

আইনের ফাঁকফোকর এবং প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ খেলাপি ঋণকে একটি চক্রাকার সমস্যায় পরিণত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, খেলাপি ঋণের পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন এমনভাবে করা হয় যা প্রকৃত অর্থে ঋণ আদায়ের পরিবর্তে খেলাপিদের আরও সময় ও সুযোগ করে দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত পুনঃতফসিলের নীতিমালায় কিছু শিথিলতা আনা হয়েছে, যা অনেক সময় প্রভাবশালী খেলাপিদের জন্য সুবিধা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই শিথিলতার সুযোগ নিয়ে তারা নামমাত্র কিস্তি পরিশোধ করে খেলাপি তকমা থেকে সাময়িকভাবে মুক্তি পান, কিন্তু মূল ঋণের বোঝা অপরিবর্তিত থাকে। ফলে, প্রকৃত ঋণ আদায় ব্যাহত হয় এবং ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এই সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও, কার্যকর বাস্তবায়ন এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে।

সাল মোট বিতরণকৃত ঋণ (কোটি টাকা) খেলাপি ঋণ (কোটি টাকা) খেলাপি ঋণের হার (%) সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার (%)
২০২০ (ডিসেম্বর) ১১,৫৯,৬৩৬ ৯৪,৪৪০ ৮.১৬ ১৫.৪৬
২০২১ (ডিসেম্বর) ১৩,০১,৭৯৭ ১,০৩,২৭৪ ৭.৯৩ ১৭.০৫
২০২২ (ডিসেম্বর) ১৪,৩৭,৬৯২ ১,২০,৬৫৮ ৮.১৬ ১৯.৬১
২০২৩ (ডিসেম্বর) ১৫,০৬,০৩৬ ১,৪৫,৬৩৩ ৯.৬৭ ২০.৬৭

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক (বিভিন্ন ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন)

সুপারিশ

  • অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর দ্রুত সংশোধন করে উচ্চ আদালতে রিট করে মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখার সুযোগ সীমিত করা এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে রায় কার্যকরের কঠোর বিধান অন্তর্ভুক্ত করা।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন সংক্রান্ত নীতিমালা আরও কঠোর করা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা রহিত করে ঋণ পরিশোধের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাইয়ে BIBM-এর মতো স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ গ্রহণ করা।
  • আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ঋণ অনুমোদন ও পুনরুদ্ধারে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধে একটি স্বাধীন তদারকি কমিটি গঠন করা এবং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট সাব্বির

অ্যাডভোকেট সাব্বির 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্যাংক খেলাপি ও ঋণ পুনরুদ্ধার আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator