মেধা পাচার ঠেকাতে নীতিগত দুর্বলতা: কেন বিদেশমুখী হয় আমাদের সেরা তারুণ্য? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মেধা পাচার ঠেকাতে নীতিগত দুর্বলতা: কেন বিদেশমুখী হয় আমাদের সেরা তারুণ্য?

ড. জহিরুল ইসলাম  avatar   
ড. জহিরুল ইসলাম
মেধা পাচার ঠেকাতে নীতিগত দুর্বলতা: কেন বিদেশমুখী হয় আমাদের সেরা তারুণ্য?
মেধা পাচার ঠেকাতে নীতিগত দুর্বলতা: কেন বিদেশমুখী হয় আমাদের সেরা তারুণ্য?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২২ অনুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতি বছর লক্ষাধিক শিক...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২২ অনুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতি বছর লক্ষাধিক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেও, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মসংস্থানের অভাবে বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছেন। এই প্রবণতা, যা সাধারণত 'মেধা পাচার' নামে পরিচিত, দেশের ভবিষ্যতের জন্য এক গভীর উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশেষত, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, চিকিৎসা ও গবেষণার মতো উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন ক্ষেত্রগুলোতে দেশের সেরা মেধাবীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে আগ্রহী হচ্ছেন, যা আমাদের নীতিগত দুর্বলতার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। এই চিত্র কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের উন্নয়ন যাত্রায় এক বিশাল প্রতিবন্ধকতা, যা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিকে মন্থর করে দিচ্ছে।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা, গুণগত মান এবং আধুনিকতার দিক থেকে এখনও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে বেশ পিছিয়ে। ইউজিসি'র তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হলেও, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনও সনাতনী পাঠ্যক্রম অনুসরণ করছে যা বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে অক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যে ধরনের উদ্ভাবনী গবেষণা ও প্রায়োগিক শিক্ষার প্রয়োজন, তার পর্যাপ্ত সুযোগ ও বিনিয়োগের অভাব প্রকট। দেশের গবেষণা খাতে বরাদ্দ অপ্রতুল এবং গবেষণা অবকাঠামোও দুর্বল। ফলস্বরূপ, মেধাবী শিক্ষার্থীরা, যারা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও উন্নয়নে নিজেদের নিয়োজিত করতে চান, তারা উন্নত ল্যাব, পর্যাপ্ত তহবিল এবং অভিজ্ঞ তত্ত্বাবধায়কের অভাবে বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনকি, অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধার পরিবর্তে অন্যান্য বিষয় প্রাধান্য পাওয়ায় শিক্ষকরাও মানসম্পন্ন গবেষণা ও শিক্ষাদানে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এই পরিস্থিতি দেশের সেরা তরুণদের মধ্যে হতাশার জন্ম দিচ্ছে এবং তাদের দেশের প্রতি অঙ্গীকারকে শিথিল করে তুলছে।

শিক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব এবং কর্মপরিবেশও মেধা পাচারের অন্যতম প্রধান কারণ। ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করলেও, উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের জন্য মানসম্মত ও আকর্ষণীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নীতিগত দুর্বলতা বিদ্যমান। দেশের শিল্প খাত এবং গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) সেক্টর এখনও ততটা শক্তিশালী নয় যে, উচ্চমানের মেধাবীদের ধরে রাখতে পারে। কম বেতন, কর্মক্ষেত্রে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া, এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব মেধাবীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। BANBEIS-এর তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের মেধার সঠিক পরিচর্যা ও উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত করণে ঘাটতি থাকলেও, যারা এই স্তরগুলো পেরিয়ে উচ্চশিক্ষায় ভালো করছেন, তাদের জন্য দেশে পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। এমনকি, সরকারি চাকরিতে প্রবেশেও দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রতিযোগিতার তীব্রতা অনেক মেধাবীকে বিকল্প পথ খুঁজতে উৎসাহিত করছে। বেসরকারী খাতেও উচ্চমানের গবেষণা ও উদ্ভাবনী কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায়, দেশের ভেতরে মেধার সঠিক প্রয়োগ ও বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

এছাড়াও, সামাজিক নিরাপত্তা, সুশাসনের অভাব এবং উদ্যোক্তা পরিবেশের সীমাবদ্ধতাও মেধা পাচারের জন্য দায়ী। দেশে একটি শক্তিশালী উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেমের অভাব রয়েছে, যেখানে নতুন ধারণা ও স্টার্টআপগুলো বিকশিত হতে পারে। সরকারের স্কিল ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP) কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় জোর দিলেও, উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের জন্য উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, পুঁজি বিনিয়োগে অনীহা এবং দীর্ঘমেয়াদী ভিশনের অভাব মেধাবীদের নিজেদের উদ্যোগ নিয়ে কাজ করতে নিরুৎসাহিত করছে। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাবও অনেক মেধাবীকে বিদেশের নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশে চলে যেতে প্ররোচিত করে। এই সম্মিলিত কারণগুলো একটি চক্র তৈরি করেছে, যা দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—আমাদের তারুণ্য ও মেধাকে—ক্রমাগত দেশের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি।

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রবণতা (নির্বাচিত ডেটা)
সাল বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গমনকারী দক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা (আনুমানিক) গবেষণা খাতে জিডিপির শতাংশ (% বরাদ্দ)
২০১৮ ৪৯,১৫১ ৪,২০,০০০ ০.৪৫%
২০১৯ ৫২,৪০০ ৪,৩০,০০০ ০.৪৭%
২০২০ ৩০,০০০ (কোভিড-১৯ প্রভাব) ২,৫০,০০০ (কোভিড-১৯ প্রভাব) ০.৪৮%
২০২১ ৫৫,০০০ ৪,৫০,০০০ ০.৪৯%
২০২২ ৬১,০০০ ৪,৮০,০০০ ০.৫০%

উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন, ব্যুরো অফ ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিএমইটি), ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিক্স (UIS), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা।

সুপারিশ

  • উচ্চশিক্ষার পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ এবং গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি: ইউজিসি-কে নির্দেশ দিতে হবে যেন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের পাঠ্যক্রম নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী হালনাগাদ করে। একই সাথে, সরকারি বাজেটে গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) জিডিপির ১% বরাদ্দ নিশ্চিত করার জন্য একটি নতুন 'জাতীয় গবেষণা তহবিল আইন' প্রণয়ন করা যেতে পারে, যা শুধু মৌলিক গবেষণাকেই নয়, প্রায়োগিক ও শিল্প-ভিত্তিক গবেষণাকেও উৎসাহিত করবে।
  • দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নীতিগত সমন্বয়: ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA)-কে শিল্প খাতের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করার জন্য একটি 'শিল্প-শিক্ষা অংশীদারিত্ব নীতিমালা' তৈরি করতে হবে, যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের জন্য শিল্প-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ এবং উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। SEIP-এর মতো প্রকল্পগুলোর আওতায় শুধুমাত্র কারিগরি নয়, উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের জন্য উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে।
  • মেধাবীদের জন্য আকর্ষণীয় কর্মপরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: সরকার একটি 'মেধা সুরক্ষা ও প্রণোদনা আইন' প্রবর্তন করতে পারে, যা সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই মেধাবীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বেতন কাঠামো, স্বচ্ছ পদোন্নতি নীতি এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনে পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি, BANBEIS-এর মাধ্যমে স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং জোরদার করে দেশে বিদ্যমান এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. জহিরুল ইসলাম

ড. জহিরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator