জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যক্তিগতকৃত ঔষধের সম্ভাবনা ও বাংলাদেশের বাস্তব চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যক্তিগতকৃত ঔষধের সম্ভাবনা ও বাংলাদেশের বাস্তব চ্যালেঞ্জ

ড. আদনান সামি  avatar   
ড. আদনান সামি
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যক্তিগতকৃত ঔষধের সম্ভাবনা ও বাংলাদেশের বাস্তব চ্যালেঞ্জ
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যক্তিগতকৃত ঔষধের সম্ভাবনা ও বাংলাদেশের বাস্তব চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
২০২২ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক স্বাস্থ্য বুলেটিনে দেশের অসংক্রামক ব্যাধিগুলির ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়...

২০২২ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক স্বাস্থ্য বুলেটিনে দেশের অসংক্রামক ব্যাধিগুলির ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল, যা ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশ্বব্যাপী জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির হাত ধরে ব্যক্তিগতকৃত ঔষধের যে সম্ভাবনা উন্মোচিত হচ্ছে, তা এখন আর কেবল সুদূর স্বপ্ন নয়, বরং সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা। উন্নত বিশ্বে যেখানে প্রতিটি রোগীর জিনগত বৈশিষ্ট্য, জীবনযাপন ও পরিবেশগত প্রভাব বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট ঔষধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তার বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে।

ব্যক্তিগতকৃত ঔষধ, যা প্রিসিশন মেডিসিন নামেও পরিচিত, রোগীর জিনোমিক ডেটা ব্যবহার করে রোগের সঠিক নির্ণয়, ঝুঁকি অনুমান এবং সর্বাধিক কার্যকর চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করার উপর জোর দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ক্যান্সারের চিকিৎসায় প্রচলিত কেমোথেরাপির পরিবর্তে রোগীর টিউমারের জিনোমিক প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট টার্গেটেড থেরাপি প্রয়োগ করা এখন বিশ্বজুড়ে মানসম্মত অনুশীলন। বাংলাদেশেও এই পদ্ধতির প্রয়োগ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, এবং নির্দিষ্ট কিছু সংক্রামক ব্যাধির (যেমন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে) চিকিৎসায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলি জিনোমিক্স ব্যবহারের মাধ্যমে মানসিক রোগের জিনগত উপাদানগুলি চিহ্নিত করে দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা প্রদানের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করতে পারে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রচলিত 'একই ঔষধ সবার জন্য' পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা দূর করবে। এই প্রযুক্তি শুধুমাত্র রোগ নিরাময়েই নয়, বরং রোগের পূর্বাভাস এবং প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম, যা জনস্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তবে, বাংলাদেশে এই প্রযুক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পথে বেশ কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। প্রথমত, জিনোমিক সিকোয়েন্সিং এবং বায়োইনফরমেটিক্স বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক গবেষণাগার ও দক্ষ জনবলের অভাব একটি বড় বাধা। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) কিছু সংক্রামক রোগের জিনোমিক নজরদারি শুরু করলেও, অসংক্রামক রোগ এবং ব্যক্তিগতকৃত ঔষধের ক্ষেত্রে এর পরিধি সীমিত। দ্বিতীয়ত, রোগীর ডেটা সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বিশ্লেষণের জন্য একটি সুসংহত ও নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো এখনো অপ্রতুল। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এই বিষয়ে নীতিগত দিকনির্দেশনা দিলেও, এর বাস্তবায়ন ধীরগতিতে চলছে। তৃতীয়ত, জিনোমিক ডেটার গোপনীয়তা এবং নৈতিক ব্যবহার নিয়ে সুস্পষ্ট আইন ও প্রবিধানের অভাব রয়েছে, যা রোগীর আস্থা অর্জনে এবং গবেষণার পরিধি বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) নতুন জিনোমিক-ভিত্তিক ঔষধ ও ডায়াগনস্টিক কিটের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় এখনো আন্তর্জাতিক মানের প্রবিধান অনুসরণ করতে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত নয়, যা আধুনিক চিকিৎসার প্রসারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা না করতে পারলে ব্যক্তিগতকৃত ঔষধের সুফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (প্রাক্কলিত)
জিনোমিক সিকোয়েন্সিং প্রকল্পের সংখ্যা (সরকারি) ২ ৪ ৭ ১০
বায়োইনফরমেটিক্স বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ৫০ ৬৫ ৮০ ৯৫
পার্সোনালাইজড মেডিসিন ট্রায়ালে রোগীর অংশগ্রহণ (%) ০.৫% ০.৮% ১.২% ১.৫%
জিনোমিক ডাটা সংরক্ষণের ক্ষমতা (টেরাবাইট) ৫০ ১০০ ১৫০ ২০০

উৎস: DGHS, IEDCR এবং MOHFW-এর বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে (প্রাক্কলিত)।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক একটি জাতীয় জিনোমিক্স নীতিমালা (National Genomics Policy) প্রণয়ন করা, যা জিনোমিক ডেটা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ব্যবহার ও গবেষণার জন্য সুস্পষ্ট আইনগত ও নৈতিক কাঠামো প্রদান করবে এবং DGDA-কে জিনোমিক-ভিত্তিক ঔষধ ও ডায়াগনস্টিকের দ্রুত অনুমোদনের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রবিধানমালা তৈরি ও প্রয়োগের ক্ষমতা দেবে।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এর তত্ত্বাবধানে একাধিক আঞ্চলিক জিনোমিক সিকোয়েন্সিং ল্যাবরেটরি স্থাপন করা এবং বায়োইনফরমেটিক্স ও জিনোমিক্স বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা, যাতে আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের সকল প্রধান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল জিনোমিক পরীক্ষা পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) সহ অন্যান্য বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ব্যক্তিগতকৃত ঔষধ গবেষণা ও প্রয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ করা এবং এ সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য একটি কেন্দ্রীয় ফান্ড (Central Genomics Research Fund) গঠন করা, যা দেশীয় গবেষকদের উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলিতে অর্থায়ন করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. আদনান সামি

ড. আদনান সামি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator