তিস্তা মহাপরিকল্পনা: চীনের কৌশলগত প্রভাব ও বাংলাদেশের পানিসম্পদ কূটনীতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তিস্তা মহাপরিকল্পনা: চীনের কৌশলগত প্রভাব ও বাংলাদেশের পানিসম্পদ কূটনীতি

সায়েম মালিক  avatar   
সায়েম মালিক
তিস্তা মহাপরিকল্পনা: চীনের কৌশলগত প্রভাব ও বাংলাদেশের পানিসম্পদ কূটনীতি
তিস্তা মহাপরিকল্পনা: চীনের কৌশলগত প্রভাব ও বাংলাদেশের পানিসম্পদ কূটনীতি
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুর...

সম্প্রতি, বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, যা দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষত, তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাটসহ তিস্তা অববাহিকার জেলাগুলোতে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে, মহাপরিকল্পনাটি নদী ড্রেজিং, বাঁধ নির্মাণ, ভূমি পুনরুদ্ধার এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার এবং বর্ষা মৌসুমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের কৃষি খাতে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানিশূন্যতা কৃষকদের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা সেচ প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১.৩০ লাখ হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসার কথা থাকলেও, পানির অভাবে তা প্রায় ৪০-৫০ হাজার হেক্টরে নেমে এসেছে। এই মহাপরিকল্পনা সফল হলে, আধুনিক সেচ অবকাঠামো নির্মাণ এবং পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে DAE আরও বেশি জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে, যা খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর বিজ্ঞানীরা তিস্তা অববাহিকার জন্য খরা সহনশীল ও উচ্চ ফলনশীল জাতের উদ্ভাবনে কাজ করছেন, কিন্তু পর্যাপ্ত পানির অভাবে তাদের গবেষণার পূর্ণ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। মহাপরিকল্পনাটি পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করলে BARI ও BRRI উদ্ভাবিত জাতগুলো কৃষকদের কাছে পৌঁছানো এবং উৎপাদন বৃদ্ধি করা সহজ হবে। এছাড়া, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে পানি ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা এই মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তব রূপ পেতে পারে।

চীনের এই প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বাংলাদেশের পানি সম্পদ কূটনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ঐতিহ্যগতভাবে ভারত বাংলাদেশের প্রধান নদী অংশীদার হলেও, তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা গ্রহণ বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই মহাপরিকল্পনা শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ সুবিধা বৃদ্ধি করবে না, বরং তিস্তা নদীর ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে এর নাব্যতা ফিরিয়ে আনবে, যা অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগ এবং মৎস্য সম্পদের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় তিস্তা অববাহিকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের উপর জোর দিয়েছে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় টেকসই সমাধান অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। চীনের এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক নদী কূটনীতিতে ভারতের সাথে আলোচনায় একটি নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পারে, যেখানে বাংলাদেশ তার নিজস্ব পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়িয়ে আঞ্চলিক জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে আসতে পারে।

সূচক ২০২০-২১ সাল (আনুমানিক) ২০৩০ সাল (প্রত্যাশিত, মহাপরিকল্পনা সফল হলে)
তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতাধীন সেচকৃত এলাকা (লাখ হেক্টর) ০.৫০ ১.৩০
তিস্তা অববাহিকায় ধান উৎপাদন বৃদ্ধি (%) -৫% (জলবায়ু প্রভাব) +১৫-২০%
বন্যা কবলিত এলাকার পরিমাণ হ্রাস (%) - ২৫-৩০%
নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি (কিলোমিটার) - ৫০-৬০

উৎস: পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, DAE, BRRI এর প্রাক্কলিত তথ্য ও গবেষণা পত্র।

সুপারিশ

  • পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কারিগরি কমিটি গঠন করতে হবে, যেখানে BARC, BARI এবং BRRI এর বিশেষজ্ঞগণ অন্তর্ভুক্ত থাকবেন, যাতে প্রকল্প নকশা ও বাস্তবায়নে কৃষি ও পরিবেশগত দিকগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।
  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে মহাপরিকল্পনার পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) প্রক্রিয়াকে কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং তিস্তা অববাহিকার জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সুনির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষত আন্তর্জাতিক পরিবেশ আইন ও প্রোটোকল মেনে।
  • সরকারকে আন্তর্জাতিক নদী কমিশন (International Rivers Commission) বা অনুরূপ আন্তর্জাতিক ফোরামে তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু করতে হবে, যাতে ভারতের সাথে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নে একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থান তৈরি হয় এবং আঞ্চলিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সায়েম মালিক

সায়েম মালিক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator