জেলা ক্রিকেট পাইপলাইনে অর্থায়ন: প্রতিভা বিকাশে পুঁজির সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জেলা ক্রিকেট পাইপলাইনে অর্থায়ন: প্রতিভা বিকাশে পুঁজির সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ

নাবিল কায়সার  avatar   
নাবিল কায়সার
জেলা ক্রিকেট পাইপলাইনে অর্থায়ন: প্রতিভা বিকাশে পুঁজির সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ
জেলা ক্রিকেট পাইপলাইনে অর্থায়ন: প্রতিভা বিকাশে পুঁজির সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে যে, জেলা পর্যায়ের ক্রিকেট অবকাঠামো ও প্রতিভা অন্বেষণে গত অর্থবছর (২০২২-...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে যে, জেলা পর্যায়ের ক্রিকেট অবকাঠামো ও প্রতিভা অন্বেষণে গত অর্থবছর (২০২২-২০২৩) বরাদ্দকৃত তহবিলের মাত্র ৪২% ব্যয় হয়েছে। এই অপর্যাপ্ত ব্যয় এবং তহবিলের অব্যবস্থাপনা দেশের জেলা ক্রিকেট পাইপলাইনে প্রতিভা বিকাশের জন্য দীর্ঘদিনের অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জগুলিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে, তৃণমূল পর্যায়ের কোচিং, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং লিগ আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাবে প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের বড় মঞ্চে আসার পথ রুদ্ধ হচ্ছে, যা জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ শক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও বিসিবি-কে জরুরি ভিত্তিতে একটি সমন্বিত ও কার্যকর অর্থায়ন মডেল প্রণয়নের দিকে নজর দিতে হবে, যা দেশের ক্রিকেটের ভিত্তি মজবুত করতে সহায়ক হবে।

জেলা ক্রিকেট পাইপলাইনের অর্থায়নের মূল সীমাবদ্ধতা শুধু অপ্রতুল বরাদ্দেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এই বরাদ্দের সুষ্ঠু বন্টন ও তদারকির অভাবও একটি বড় সমস্যা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলো (ডিএসএ) বিসিবি থেকে প্রাপ্ত তহবিল সময় মতো পায় না অথবা প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে যায়। উদাহরণস্বরূপ, রংপুর জেলা ক্রিকেট দল গত বছর স্থানীয় একটি টুর্নামেন্টের জন্য নির্ধারিত বিসিবি অনুদান পেতে প্রায় ছয় মাস বিলম্বের সম্মুখীন হয়েছিল, যা তাদের প্রস্তুতি ও খেলোয়াড়দের মনোবলকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছিল। স্থানীয় স্পন্সরশিপের অভাবও এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তোলে। ছোট শহর বা গ্রামীণ অঞ্চলগুলিতে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলির বিনিয়োগের আগ্রহ কম থাকায়, জেলা দলগুলি শুধুমাত্র বিসিবি অনুদানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে, মানসম্মত প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, উন্নত পিচ তৈরি এবং পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া, অনেক জেলায় আধুনিক অনুশীলন সুবিধার অভাব রয়েছে। বিসিবি'র 'ভিশন-২০৩০' কর্মসূচির আওতায় জেলা পর্যায়ে আধুনিক একাডেমি তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও, পর্যাপ্ত পুঁজি এবং স্থানীয় ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতায় তা ধীর গতিতে চলছে, যা প্রতিভাবান তরুণদের মানসম্মত প্রশিক্ষণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে।

অর্থায়নের এই সংকট কেবল অবকাঠামোতেই নয়, বরং কোচিং স্টাফদের যোগ্যতা ও প্রাপ্যতাতেও প্রভাব ফেলছে। অনেক জেলায় এখনও স্বেচ্ছাসেবক কোচ বা অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের উপর নির্ভর করতে হয়, কারণ পেশাদার ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোচদের জন্য পর্যাপ্ত বেতন বা সুযোগ-সুবিধা প্রদানের সামর্থ্য ডিএসএগুলির নেই। বিসিবি যদিও জাতীয় পর্যায়ে কোচিং কোর্স পরিচালনা করে, কিন্তু জেলা পর্যায়ে এসব প্রশিক্ষিত কোচদের ধরে রাখার জন্য কোনো কার্যকর প্রণোদনা প্যাকেজ নেই। এর ফলস্বরূপ, তৃণমূল থেকে উঠে আসা প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা প্রাথমিক পর্যায়েই সঠিক কৌশলগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন World Bank বা ADB, যারা বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে, তাদের সাথে বিসিবি ও বাংলাদেশ সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতাও এই সমস্যার অন্যতম কারণ। এই সংস্থাগুলো সাধারণত বৃহৎ পরিসরের প্রকল্পগুলিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়, কিন্তু জেলা পর্যায়ের ছোট ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলির জন্য অর্থায়ন সংগ্রহে প্রায়শই প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়। ফলস্বরূপ, জাতীয় দলের জন্য শক্তিশালী একটি পাইপলাইন তৈরি করার ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ের ভিত্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা দেশের ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য অশনি সংকেত।

অর্থায়ন খাত ২০২১-২২ অর্থবছর (কোটি টাকা) ২০২২-২৩ অর্থবছর (কোটি টাকা) ব্যয়কৃত শতাংশ (২০২২-২৩)
জেলা লিগ ও টুর্নামেন্ট আয়োজন ৮.৫০ ৯.২০ ৫২%
জেলা একাডেমি ও প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ১২.০০ ১৩.৫০ ৩৫%
ক্রীড়া সরঞ্জাম সরবরাহ ৪.০০ ৪.৩০ ৬৫%
কোচিং স্টাফ বেতন ও ভাতা ৫.৫০ ৬.০০ ৪৫%
অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় ২.০০ ২.২০ ৭৫%
মোট বরাদ্দ ৩১.০০ ৩৫.২০ ৪২% (গড়)

উৎস: বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন, ২০২৩

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার-এর ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়-কে যৌথভাবে একটি 'জাতীয় ক্রীড়া তহবিল' গঠন করতে হবে, যেখানে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) তহবিল থেকে বাধ্যতামূলক অংশ এবং লটারি থেকে প্রাপ্ত আয়ের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ জেলা পর্যায়ের ক্রিকেট উন্নয়নে সরাসরি বরাদ্দ করা হবে। এই তহবিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এর মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং একটি স্বাধীন কমিটি দ্বারা এর ব্যয় নিরীক্ষা করা হবে।
  • World Bank এবং Asian Development Bank (ADB)-এর সাথে যৌথভাবে একটি 'ক্রিকেট ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ' প্রকল্প চালু করতে হবে, যা জেলা পর্যায়ে আধুনিক ক্রিকেট একাডেমি স্থাপন ও উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা প্রদানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী, স্বল্প সুদের ঋণ বা অনুদান নিশ্চিত করবে। এই প্রকল্পের অধীনে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ ভূমি অধিগ্রহণে সহায়তা করবে এবং বিসিবি কারিগরি জ্ঞান প্রদান করবে।
  • বিসিবি-কে 'জেলা ক্রীড়া সংস্থা (ডিএসএ) অর্থায়ন ও তদারকি নীতিমালা-২০২৪' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে জেলা পর্যায়ের তহবিলের সুষ্ঠু বন্টন, সময়মতো অর্থ ছাড় এবং ব্যয় নিরীক্ষার জন্য কঠোর জবাবদিহিতা কাঠামো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই নীতিমালায়, প্রতিটি জেলা ডিএসএ-কে ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং তহবিলের অপচয় বা অব্যবস্থাপনার জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিল কায়সার

নাবিল কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator