জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা: বিশ্ব শান্তির রক্ষক নাকি বিভাজনের প্রতীক? | আই নিউজ বিডি

জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা: বিশ্ব শান্তির রক্ষক নাকি বিভাজনের প্রতীক?

তানিয়া সুলতানা  avatar   
তানিয়া সুলতানা
জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা: বিশ্ব শান্তির রক্ষক নাকি বিভাজনের প্রতীক?
জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা: বিশ্ব শান্তির রক্ষক নাকি বিভাজনের প্রতীক?
ছবি: সংগৃহীত
গত ১৫ই মার্চ, ২০২৪ তারিখে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবের উপর রাশিয়ার ভেটো প্রদান আন্তর্জাতিক মহলে আবারও ভেটো ক...

গত ১৫ই মার্চ, ২০২৪ তারিখে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবের উপর রাশিয়ার ভেটো প্রদান আন্তর্জাতিক মহলে আবারও ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে জোরালো বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই প্রস্তাবটি গাজায় মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছিল, যা ১৪টি সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থন পেলেও রাশিয়ার ভেটোর কারণে ভেস্তে যায়। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর হাতে থাকা ভেটো ক্ষমতা বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার রক্ষক হিসেবে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নিরাপত্তা পরিষদের এই অচলাবস্থা প্রায়শই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংকটে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে, যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তোলে।

জাতিসংঘ সনদের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলো – চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র – যেকোনো বাস্তবভিত্তিক প্রস্তাবে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী শক্তিগুলোর মধ্যে ঐকমত্য নিশ্চিত করা এবং কোনো একক ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সম্মিলিত পদক্ষেপ রোধ করা, যা বিশ্বযুদ্ধের পুনরাবৃত্তি এড়াতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হয়েছিল। তবে, সময়ের সাথে সাথে এই ক্ষমতা প্রায়শই নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে ব্যবহৃত হয়েছে, যার ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সিরিয়া সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধ, এবং ফিলিস্তিন ইস্যুসহ অসংখ্য ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদ ভেটো ক্ষমতার কারণে কোনো কার্যকর সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। এই ক্ষমতা ব্যবহারের প্রবণতা প্রায়শই জোটবদ্ধ রাজনীতিকে প্রতিফলিত করে, যেখানে একটি স্থায়ী সদস্য দেশ তার মিত্র দেশের স্বার্থ রক্ষায় ভেটো প্রদান করে, এমনকি যদি তা বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ইচ্ছার পরিপন্থী হয়। এর ফলস্বরূপ, জাতিসংঘ তার মূল লক্ষ্য – আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা – অর্জনে বারবার হোঁচট খাচ্ছে এবং এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্রমশ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

ভেটো ক্ষমতার এই অপব্যবহারের কারণে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোতেও জাতিসংঘকে অনেক সময় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। যখন কোনো স্থায়ী সদস্য দেশ নিজের বা তার মিত্রদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন যেকোনো প্রস্তাব আটকে দেয়, তখন এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও জনগণের উপর। এটি জাতিসংঘের মূল স্তম্ভ, অর্থাৎ সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাকে দুর্বল করে তোলে। বহুবার বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে, যেখানে ভেটো ক্ষমতা সীমিত করা বা এর ব্যবহারকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর পক্ষ থেকে এমন সংস্কারের প্রতি অনীহা স্পষ্ট। এমনকি, বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে জাতিসংঘের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে, বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য। আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা যেমন সার্ক এবং BIMSTEC-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতেও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়, যেখানে ভেটো ক্ষমতা প্রায়শই একটি বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়। UN Peacekeeping মিশনগুলোতে সৈন্য পাঠানো দেশগুলোও প্রায়শই নিরাপত্তা পরিষদের রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে তাদের মিশনের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে বাধার সম্মুখীন হয়, যা তাদের ঝুঁকির মাত্রাও বাড়িয়ে দেয়।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার ব্যবহার (১৯৪৬-২০২২)
দেশ মোট ভেটোর সংখ্যা মোট গৃহীত প্রস্তাবের সংখ্যা (১৯৪৬-২০২২) ভেটো প্রদত্ত প্রস্তাবের গড় হার
রাশিয়া (সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ) ১২১ ২,৯৫০ ৪.১০%
যুক্তরাষ্ট্র ৮২ ২,৯৫০ ২.৭৮%
যুক্তরাজ্য ২৯ ২,৯৫০ ০.৯৮%
চীন (গণপ্রজাতন্ত্রী চীন ও প্রজাতন্ত্রী চীন সহ) ১৭ ২,৯৫০ ০.৫৭%
ফ্রান্স ১৮ ২,৯৫০ ০.৬১%

উৎস: UN Digital Library, Security Council Report, Uppsala Conflict Data Program (UCDP)

সুপারিশ

  • ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে "দায়িত্বশীলতার কোড" (Code of Conduct regarding Security Council action against genocide, crimes against humanity or war crimes) বাস্তবায়ন করা। এই কোডটি ফ্রান্স এবং মেক্সিকো কর্তৃক প্রস্তাবিত হয়েছে এবং এর লক্ষ্য হলো গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের মতো গুরুতর পরিস্থিতিতে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ থেকে বিরত থাকা। এর মাধ্যমে স্থায়ী সদস্যরা মানবিক সংকটে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হবে।
  • জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণ করা এবং নতুন স্থায়ী সদস্যদের জন্য ভেটো ক্ষমতা সীমিত করা। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়া থেকে নতুন স্থায়ী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে তাদের 'সফট ভেটো' বা 'কনস্ট্রাকটিভ অ্যাবস্টেনশন' এর মতো ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে, যেখানে তারা সরাসরি প্রস্তাব বাতিল না করে নিজেদের আপত্তি নথিভুক্ত করতে পারবে, যা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
  • জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো দ্বারা অবরুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো পুনরায় বিবেচনার সুযোগ তৈরি করা। "ইউনাইটিং ফর পিস" (Uniting for Peace) রেজোলিউশনটির মতো একটি প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও নিয়মিত প্রয়োগ করা, যা সাধারণ পরিষদকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার উপর পদক্ষেপ নিতে ক্ষমতা দেয় যখন নিরাপত্তা পরিষদ ভেটোর কারণে অকার্যকর হয়ে পড়ে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানিয়া সুলতানা

তানিয়া সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator