নতুন কারিকুলাম ও শিক্ষকের প্রস্তুতি: শ্রেণিকক্ষের চ্যালেঞ্জ নাকি প্রশিক্ষণের ঘাটতি? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নতুন কারিকুলাম ও শিক্ষকের প্রস্তুতি: শ্রেণিকক্ষের চ্যালেঞ্জ নাকি প্রশিক্ষণের ঘাটতি?

কাজী মাকসুদুল হক  avatar   
কাজী মাকসুদুল হক
নতুন কারিকুলাম ও শিক্ষকের প্রস্তুতি: শ্রেণিকক্ষের চ্যালেঞ্জ নাকি প্রশিক্ষণের ঘাটতি?
নতুন কারিকুলাম ও শিক্ষকের প্রস্তুতি: শ্রেণিকক্ষের চ্যালেঞ্জ নাকি প্রশিক্ষণের ঘাটতি?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রবর্তিত নতুন শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন নিয়ে দেশব্যাপী শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ মহলে এক মিশ্র প্রত...

সম্প্রতি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রবর্তিত নতুন শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন নিয়ে দেশব্যাপী শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ মহলে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, মাধ্যমিক স্তরের নতুন কারিকুলাম, যা ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে এবং ২০২৪ সাল থেকে অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে চালু হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসু মনোভাব ও বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা তৈরি করা। তবে মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের সাথে আলাপকালে এবং বিভিন্ন ফোরামে উঠে আসা তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এই যুগান্তকারী পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শিক্ষকরা এক গভীর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যেমন ব্যানবেইস (BANBEIS) ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, তাদের নিজস্ব মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিলেও, শ্রেণিকক্ষে নতুন পদ্ধতির সফল প্রয়োগে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো এখনো প্রকট। বিশেষ করে, প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত এই নতুন কারিকুলামে শিখন-শেখানো পদ্ধতি, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুতে যে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা শিক্ষকদের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে।

নতুন শিক্ষাক্রমের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন (Experiential Learning) এবং পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর (PI) ও ট্রান্সভার্সাল কম্পিটেন্সি (TC) ভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি। এই পদ্ধতি অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি তাদের সামাজিক, আবেগিক ও ব্যবহারিক দক্ষতা বিকাশের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শিক্ষকদের পর্যাপ্ত ও কার্যকর প্রশিক্ষণের অভাবে এই পদ্ধতি শ্রেণিকক্ষে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষক জানিয়েছেন, তাদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তা ছিল অত্যন্ত স্বল্প সময়ের এবং তত্ত্বগত। বাস্তব শ্রেণিকক্ষে কীভাবে একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে অভিজ্ঞতাভিত্তিক উপায়ে উপস্থাপন করতে হবে, শিক্ষার্থীদের দলগত কাজ কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, বা কীভাবে তাদের পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর অনুযায়ী মূল্যায়ন করতে হবে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত ব্যবহারিক দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞান বিষয়ে হাতে-কলমে পরীক্ষার আয়োজন বা সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে বিতর্ক বা প্রজেক্ট উপস্থাপনার জন্য যে লজিস্টিক সাপোর্ট ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, তা অনেক স্কুলেই অনুপস্থিত। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৬০% মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার বা ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য পর্যাপ্ত উপকরণের অভাব রয়েছে, যা নতুন কারিকুলামের সফল বাস্তবায়নে বড় বাধা। এমনকি, শিক্ষকদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যও যে প্রশিক্ষণগুলো পরিচালিত হয়েছে, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অনলাইন রিসোর্স তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো পর্যাপ্তভাবে কভার করতে পারেনি।

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের গুণগত মান এবং সময়কাল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) তাদের দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের মডেলকে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োগের কথা বললেও, শিক্ষকদের জন্য পরিচালিত প্রশিক্ষণগুলো প্রায়শই 'একমুখী' এবং 'উপদেশমূলক' হয়, যেখানে শিক্ষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বা তাদের সমস্যার সমাধানমূলক আলোচনার সুযোগ সীমিত থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাকে উৎসাহিত করলেও, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য এর বাস্তবায়ন এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলামের জন্য যে প্রশিক্ষক প্যানেল তৈরি করা হয়েছে, তাদের অনেকেরই অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন বা নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে গভীর ধারণা নেই। ফলস্বরূপ, প্রশিক্ষণার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ফিরে গিয়ে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে গিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে, নতুন কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের জন্য যে 'শিখন অভিজ্ঞতা' ডিজাইন করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষকদের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের আগ্রহকে কাজে লাগানোর ক্ষমতা থাকা আবশ্যক। কিন্তু প্রচলিত প্রশিক্ষণ পদ্ধতি শিক্ষকদের এই সক্ষমতা তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনেক শিক্ষক মনে করেন, তাদের জন্য আরও দীর্ঘমেয়াদী, মেন্টরশিপভিত্তিক এবং বাস্তব শ্রেণিকক্ষ পরিস্থিতিকেsimulate করে এমন প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর তাদের কারিগরি শিক্ষকদের জন্য হাতে-কলমে প্রশিক্ষণে যে গুরুত্ব দেয়, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণেও সেই ধরনের ব্যবহারিক প্রয়োগের ওপর জোর দেওয়া জরুরি।

শিক্ষাবর্ষ নতুন কারিকুলামে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার (মাধ্যমিক) প্রশিক্ষণার্থী প্রতি গড় প্রশিক্ষণের সময়কাল (ঘণ্টা) শিক্ষকদের নতুন কারিকুলাম সফল প্রয়োগে আত্মবিশ্বাসের স্তর (১-৫ স্কেলে)
২০২৩ ৭২% ৩৫ ২.৮
২০২৪ ৮৫% ৪০ ৩.২
২০২৫ (লক্ষ্যমাত্রা) ১০০% ৬০ ৪.৫

উৎস: বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণ সেল, ২০২৪।

সুপারিশ

  • প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রণীত নতুন কারিকুলামের ওপর আরও গভীর ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রশিক্ষণ কমপক্ষে ৬০ ঘণ্টা দীর্ঘ হতে হবে এবং এতে মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম ও শ্রেণিকক্ষভিত্তিক কেস স্টাডি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA)-এর দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ মডেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর আলোকে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ করতে হবে এবং প্রশিক্ষণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর মাধ্যমে নিয়মিত মূল্যায়ন ও ফলোআপ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, যাতে প্রশিক্ষণের পর শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
  • বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর সহায়তায় দেশের শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন কারিকুলামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে 'শিক্ষক শিক্ষা' পাঠ্যক্রম সংশোধন করতে হবে এবং শিক্ষকদের জন্য অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ও রিসোর্স হাব তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা প্রতিনিয়ত নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি, মূল্যায়ন কৌশল এবং ডিজিটাল টুলস সম্পর্কে জানতে পারবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কাজী মাকসুদুল হক

কাজী মাকসুদুল হক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator