কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা: আইন আছে, প্রয়োগ কই? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা: আইন আছে, প্রয়োগ কই?

অ্যাডভোকেট তানিয়া  avatar   
অ্যাডভোকেট তানিয়া
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা: আইন আছে, প্রয়োগ কই?
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা: আইন আছে, প্রয়োগ কই?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ লেবার স্টাডিজ (BILS) কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের পোশাক শিল্পের প্রায় ৬৫% শ্রমিক মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ লেবার স্টাডিজ (BILS) কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের পোশাক শিল্পের প্রায় ৬৫% শ্রমিক মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতায় ভোগেন, যার মধ্যে ৩০% কর্মক্ষেত্রে সরাসরি হয়রানি বা প্রতিকূল পরিবেশের শিকার। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি খাতের চিত্র হলেও, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার আইনি কাঠামো ও তার প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে। আইনগত সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও, কেন কর্মজীবীরা এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের শ্রম আইনে কর্মীদের শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষার বিষয়টি পরোক্ষভাবে স্বীকৃত হলেও, এর সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত বিধানের অভাব দীর্ঘদিনের। যদিও বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) কর্মপরিবেশকে 'নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর' রাখার কথা বলে, মানসিক স্বাস্থ্যের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা বা এর সুরক্ষায় নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতার সুস্পষ্ট নির্দেশনা বিরল। মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলেও, এটি মূলত মানসিক অসুস্থতা নির্ণয়, চিকিৎসা ও অধিকার নিশ্চিত করার উপর জোর দেয়, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ ও সুরক্ষায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার উপর এর সরাসরি প্রয়োগিক নির্দেশনা সীমিত। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) মানসিক স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখলেও, কর্মপরিবেশে এর বাস্তবায়ন তদারকির জন্য কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকার ঘাটতি প্রকট। ফলে, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ, মানসিক চাপ মোকাবিলায় সহায়ক পরিবেশ তৈরি এবং প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং বা সহায়তার ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাদের উপর আইনি বাধ্যবাধকতা প্রায় অনুপস্থিত।

এই আইনি ফাঁক এবং প্রয়োগের দুর্বলতার কারণে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করলেও, কর্মক্ষেত্রে এর ব্যবহারিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ, হয়রানি, অতিরিক্ত কাজের চাপ, কর্ম-জীবনের ভারসাম্যহীনতা এবং কর্মপরিবেশের প্রতিকূলতা মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অথচ, এসব সমস্যা চিহ্নিতকরণ বা সমাধানে নিয়োগকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলক কোনো প্রোটোকল নেই। কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য যে ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যেমন – কর্মীর জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম, কাজের চাপ নিয়ন্ত্রণ, হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা – তা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই নেই। ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) মানসিক স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট ঔষধপত্রের মান নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে তাদের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা নেই, যা প্রমাণ করে যে সমস্যাটির সমাধান মূলত স্বাস্থ্যসেবার বাইরে, কর্মপরিবেশের মধ্যেই খুঁজতে হবে।

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বর্তমান চিত্র এবং এর আইনি প্রয়োগের ফাঁকফোকর বুঝতে কিছু বাস্তব তথ্য সহায়ক:

সূচক/প্রতিবেদন ২০১৯ ২০২১ ২০২৩
কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ অনুভবকারী শ্রমিকের শতাংশ (IEDCR সমীক্ষা) ৪০% ৫২% ৬১%
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রাপ্তি (প্রতিষ্ঠানভিত্তিক) ৫% ৭% ৯%
কর্মক্ষেত্রে হয়রানি বা বৈষম্যের শিকার হওয়ার প্রতিবেদন (শ্রমিক অধিকার সংস্থা) ১৫% ১৮% ২২%
অতিরিক্ত কাজের চাপে অসুস্থতা জনিত ছুটির বৃদ্ধি (বার্ষিক গড়) ৭% ১১% ১৪%

উৎস: IEDCR, BILS এবং বিভিন্ন শ্রমিক অধিকার সংস্থার প্রতিবেদন থেকে সংকলিত।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ধারা সংযোজন করা, যেখানে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ, হয়রানি, বৈষম্য এবং কর্ম-জীবনের ভারসাম্যহীনতা নিরসনে নিয়োগকর্তাদের সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা ও পদক্ষেপ গ্রহণের রূপরেখা থাকবে। এই সংশোধনীতে MOHFW এবং DGHS-এর নেতৃত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH)-এর মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত গবেষণা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির প্রসার ঘটানো। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য NIMH-এর তত্ত্বাবধানে কাউন্সেলিং ও সাইকো-এডুকেশন সেবার প্রবর্তন এবং প্রশিক্ষিত পেশাদারদের নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার জন্য একটি জাতীয় গাইডলাইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি মনিটরিং ও ইভালুয়েশন ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা। এতে নিয়োগকর্তাদের জন্য নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি অ্যাসেসমেন্ট পরিচালনা, কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য ডেটা সংগ্রহ (গোপনীয়তা বজায় রেখে) এবং DGDA কর্তৃক অনুমোদিত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পদ্ধতির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে আইনগত প্রয়োগের পাশাপাশি বাস্তবায়নও নিয়মিত তদারকি করা যায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট তানিয়া

অ্যাডভোকেট তানিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator