গবেষণাগার থেকে শিল্পাঙ্গন: বাংলাদেশের R&D উদ্ভাবনের বাণিজ্যিকীকরণ চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গবেষণাগার থেকে শিল্পাঙ্গন: বাংলাদেশের R&D উদ্ভাবনের বাণিজ্যিকীকরণ চ্যালেঞ্জ

ড. সায়মা হুদা  avatar   
ড. সায়মা হুদা
গবেষণাগার থেকে শিল্পাঙ্গন: বাংলাদেশের R&D উদ্ভাবনের বাণিজ্যিকীকরণ চ্যালেঞ্জ
গবেষণাগার থেকে শিল্পাঙ্গন: বাংলাদেশের R&D উদ্ভাবনের বাণিজ্যিকীকরণ চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২২ অনুসারে, দেশের ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৯টি মৌলিক গ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২২ অনুসারে, দেশের ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৯টি মৌলিক গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ পেয়েছে, যা মোট গবেষণা বরাদ্দের মাত্র ৩২ শতাংশ। বাকি ৬৮ শতাংশ বরাদ্দ মূলত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রকাশনা ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত কাজে ব্যয় হয়েছে। এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদ্ভাবনী গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কার্যক্রমে বিনিয়োগের দুর্বল চিত্র তুলে ধরে, যা গবেষণাগারে উৎপাদিত জ্ঞানকে শিল্পাঙ্গনে বাণিজ্যিকীকরণের পথে এক দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই সীমিত বিনিয়োগ এবং লক্ষ্যহীন গবেষণা সংস্কৃতি দেশের উদ্ভাবনী বাস্তুতন্ত্রকে দুর্বল করে রাখছে, যেখানে গবেষণার ফলাফল প্রায়শই একাডেমিক প্রকাশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, শিল্প বা সমাজের বাস্তবিক সমস্যা সমাধানে তার প্রয়োগ দুর্লভ।

বাংলাদেশের R&D ইকোসিস্টেমের মূল দুর্বলতা হলো গবেষণার সাথে শিল্পের সেতুবন্ধনের অভাব এবং জাতীয় কৌশলগত অগ্রাধিকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ গবেষণা এজেন্ডার অনুপস্থিতি। যদিও বাংলাদেশ সরকার, বিশেষত কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA)-এর মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিচ্ছে, কিন্তু এই উদ্যোগগুলো প্রায়শই গতানুগতিক কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং শ্রমবাজারের তাৎক্ষণিক চাহিদার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। উদ্ভাবনী R&D-এর জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চতর কারিগরি দক্ষতা এবং মৌলিক গবেষণার মধ্যে সমন্বয় এখনো অপ্রতুল। উদাহরণস্বরূপ, NSDA কর্তৃক প্রণীত জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালায় শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হলেও, গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত দক্ষতা যেমন — প্রোটোটাইপিং, পেটেন্ট আবেদন, বাজার বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের অভাব প্রকট। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো)-এর তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে (TVET) তালিকাভুক্তি বাড়ছে, কিন্তু এই শিক্ষা ব্যবস্থায় R&D-ভিত্তিক উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা মডেলের অভাব রয়েছে। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা প্রচলিত কারিগরি জ্ঞান অর্জন করলেও, শিল্প-সংশ্লিষ্ট উদ্ভাবনী প্রকল্পে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে, যা তাদের R&D-ভিত্তিক ক্যারিয়ারের জন্য প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হয়।

গবেষণার বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হলো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতা এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা। যদিও সরকার স্ট্রেংদেনিং ইন্টিগ্রেটেড কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স ইন টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভকেশনাল এডুকেশন (SEIP) প্রকল্পের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষায় গুণগত মান বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করছে, এই বিনিয়োগ মূলত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ। R&D-এর জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদী, ঝুঁকি-সহনশীল অর্থায়ন এবং পেটেন্ট সুরক্ষা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা এখনও অনুপস্থিত। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ল্যাবগুলো প্রায়শই বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে এবং তাদের মধ্যে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক বা শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা খুবই সীমিত। উদ্ভাবনী গবেষণা থেকে একটি সফল পণ্য বা সেবায় রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন বহুমুখী দক্ষতা, যার মধ্যে রয়েছে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ব্যবসা এবং আইনি সহায়তা। কিন্তু এই সমন্বিত পদ্ধতির অভাব বিদ্যমান। উপরন্তু, উদ্ভাবকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রণোদনা এবং ঝুঁকি গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। একটি উদ্ভাবন যখন গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে আসে, তখন তার প্রোটোটাইপ তৈরি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মান নিয়ন্ত্রণ, বিপণন এবং চূড়ান্তভাবে বাণিজ্যিকীকরণের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এবং আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন, যা বর্তমানে বাংলাদেশের R&D ইকোসিস্টেমে অনুপস্থিত। এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে না পারলে, বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে, এবং স্থানীয় উদ্ভাবকরা তাদের মেধা ও আবিষ্কারের পূর্ণ সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পারবে না।

সূচক ২০১৮-১৯ অর্থবছর ২০২০-২১ অর্থবছর ২০২২-২৩ অর্থবছর (প্রাক্কলিত)
মোট R&D খাতে সরকারি ব্যয় (জিডিপির শতাংশ) ০.০৫% ০.০৬% ০.০৭%
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বরাদ্দ (মোট বাজেট %) ১.২% ১.৫% ১.৮%
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের R&D সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে বরাদ্দ (%) ০.৮% ১.০% ১.২%
NSDA-এর মাধ্যমে উদ্ভাবনী দক্ষতা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ১,৫০০ ২,২০০ ৩,১০০
পেটেন্ট আবেদন (বাংলাদেশ) ৬২ ৭৮ ৯৫

উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন, BANBEIS, শিল্প মন্ত্রণালয়, NSDA, SEIP প্রকল্প দলিলাদি।

সুপারিশ

  • জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন কাউন্সিল (NRIC) গঠন: একটি শক্তিশালী জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন কাউন্সিল (NRIC) গঠন করা হোক, যা জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি-২০১৬ এর আলোকে গঠিত হবে এবং এর প্রধান কাজ হবে দেশের কৌশলগত অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করে R&D অর্থায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা। এই কাউন্সিল ইউজিসি, NSDA এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর সাথে সমন্বয় করে গবেষণা প্রকল্পগুলোকে বাণিজ্যিকীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর কেন্দ্র স্থাপন এবং পেটেন্ট সহায়তার জন্য একটি একক উইন্ডো সেবা নিশ্চিত করবে।
  • শিল্প-একাডেমিয়া সমন্বয় বাধ্যতামূলককরণ: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর অফিস (TTO) প্রতিষ্ঠা বাধ্যতামূলক করা হোক এবং তাদের বার্ষিক ইউজিসি মূল্যায়নে শিল্প-সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও বাণিজ্যিকীকৃত উদ্ভাবনের সংখ্যাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। SEIP প্রকল্পের অধীনে বর্তমানে যে শিল্প-সংযোগ রয়েছে, তার পরিধি বাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারগুলো থেকে উদ্ভাবিত প্রোটোটাইপগুলোকে শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী করার জন্য পাইলট প্রকল্প এবং ইনকিউবেটর স্থাপনে অর্থায়ন করা হোক।
  • দক্ষতা উন্নয়ন ও পেটেন্ট সুরক্ষা জোরদারকরণ: NSDA এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর অধীনে একটি বিশেষায়িত 'উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিকীকরণ দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি' চালু করা হোক, যা শুধুমাত্র R&D সংশ্লিষ্ট দক্ষতা যেমন – প্রোটোটাইপ ডিজাইন, পেটেন্ট ড্রাফটিং, বাজার বিশ্লেষণ, এবং প্রযুক্তি লাইসেন্সিং-এর উপর প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। এছাড়াও, মেধাস্বত্ব আইন-২০০৩ (সংশোধিত) এর আওতায় উদ্ভাবকদের জন্য পেটেন্ট আবেদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য পেটেন্ট ফি কমানোর জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করা হোক।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. সায়মা হুদা

ড. সায়মা হুদা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator