ভারত মহাসাগরে চীনের নৌ-বিস্তার: দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত উদ্বেগ | আই নিউজ বিডি

ভারত মহাসাগরে চীনের নৌ-বিস্তার: দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত উদ্বেগ

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
ভারত মহাসাগরে চীনের নৌ-বিস্তার: দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত উদ্বেগ
ভারত মহাসাগরে চীনের নৌ-বিস্তার: দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত উদ্বেগ
ছবি: সংগৃহীত
ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ-উপস্থিতি এবং এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব সম্প্রতি ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS) কর্...

ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ-উপস্থিতি এবং এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব সম্প্রতি ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS) কর্তৃক প্রকাশিত এক বিশদ প্রতিবেদনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে যে, গত এক দশকে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি (PLAN) ভারত মহাসাগরে তার যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের টহল সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করেছে, যা আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর কৌশলগত উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষত, চীনের 'এক অঞ্চল, এক পথ' (Belt and Road Initiative - BRI) প্রকল্পের আওতায় শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর, পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দর এবং মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্র বন্দরের মতো অবকাঠামোগত বিনিয়োগগুলো সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সম্ভাব্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, যা ভারত মহাসাগরের স্থিতিশীলতার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।

চীনের এই নৌ-বিস্তার শুধু বাণিজ্যিক স্বার্থে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য। বেইজিং এর 'স্ট্রিং অফ পার্লস' কৌশল, যা ভারত মহাসাগরের উপকূলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও নৌ-অবকাঠামো নির্মাণ বা অধিগ্রহণের মাধ্যমে চীনের সামুদ্রিক প্রভাববলয় তৈরি করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এক জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে মালদ্বীপে চীনা নৌবাহিনীর একটি সাবমেরিনের উপস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে। এটি শুধু ভারতের নয়, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ, কারণ তাদের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ সরাসরি ভারত মহাসাগরের স্থিতিশীলতার উপর নির্ভরশীল। চীনের এই উপস্থিতি আঞ্চলিক বাণিজ্যিক পথগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেয়, যা ছোট রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উপর জোর দিয়েছে এবং সকল প্রকার সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে অবস্থান ব্যক্ত করেছে, যা আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতার পরিপন্থী।

এই ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাবের মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। যদিও সার্ক (SAARC) রাজনৈতিক কারণে বর্তমানে নিষ্ক্রিয়, BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এর মতো আঞ্চলিক জোট ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, BIMSTEC এর অধীনে সদস্য রাষ্ট্রগুলো সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করতে পারে, যা ভারত মহাসাগরের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সহায়তা করবে। এছাড়া, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping) কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সৈন্য প্রেরণের অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা তাদের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলো সামুদ্রিক নিরাপত্তা অনুশীলনে অংশগ্রহণ করতে পারে, যা ভারত মহাসাগরে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার গুরুত্ব তুলে ধরবে। চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ-শক্তির বিপরীতে, আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব সামুদ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করা অপরিহার্য, যাতে কোনো একক শক্তির একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি না হয় এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে।

বছর ভারত মহাসাগরে চীনা নৌ-উপস্থিতির প্রধান ঘটনা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর কৌশলগত প্রতিক্রিয়া (উদাহরণ) প্রভাবিত দেশ/অঞ্চল
২০১৪ প্রথমবারের মতো চীনা সাবমেরিনের শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে ভিড়। ভারত ও জাপানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংলাপের সূচনা। শ্রীলঙ্কা, ভারত, জাপান
২০১৭ শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য চীনের কাছে ইজারা। বাংলাদেশের কোস্টগার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাপানের সহায়তা গ্রহণ (জাপান-বাংলাদেশ কোস্টগার্ড সহযোগিতা চুক্তি)। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ভারত
২০২০ চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি (PLAN) দ্বারা ভারত মহাসাগরে নিয়মিত মহড়া ও টহল বৃদ্ধি। ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়া-জাপান (কোয়াড) এর মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংলাপ ও মহড়া বৃদ্ধি। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান
২০২২ চীনের গবেষণা জাহাজ 'ইউয়ান ওয়াং ৫' শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরে ভিড়। মালদ্বীপের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক ভারত মহাসাগরের ডি-মিলিটারাইজেশনের আহ্বান। শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভারত
২০২৩ পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে যৌথ নৌ-মহড়া 'সি গার্ডিয়ান-৩' অনুষ্ঠিত। BIMSTEC এর সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা কাঠামো জোরদার করার আলোচনা। পাকিস্তান, ভারত, BIMSTEC সদস্য রাষ্ট্রসমূহ

উৎস: রয়টার্স, ডিফেন্স নিউজ, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, CSIS গবেষণা প্রতিবেদন (বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত)

সুপারিশ

  • দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে BIMSTEC কাঠামোর অধীনে একটি আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্ম (Regional Maritime Security Forum) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই প্ল্যাটফর্মের প্রধান কাজ হবে ভারত মহাসাগরে নৌ-চলাচলের তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (United Nations Convention on the Law of the Sea - UNCLOS) লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা।
  • দক্ষিণ এশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোকে যৌথভাবে একটি 'ভারত মহাসাগরীয় শান্তি ও নিরাপত্তা সনদ' (Indian Ocean Peace and Security Charter) তৈরি ও অনুমোদন করতে হবে, যেখানে এই অঞ্চলের সমুদ্র পথকে 'নিরপেক্ষ ও সামরিকীকরণমুক্ত অঞ্চল' হিসেবে ঘোষণা করা হবে। এই সনদটি UN Security Council-এর কাছে পেশ করে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।
  • সার্ক সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিরসন করে সমুদ্র অর্থনীতি (Blue Economy) এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা খাতে সুনির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। বিশেষত, UN Peacekeeping মিশনের আদলে একটি 'আঞ্চলিক সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ ও শান্তিরক্ষা ইউনিট' (Regional Maritime Observation and Peacekeeping Unit) গঠন করা যেতে পারে, যা ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথগুলোতে নজরদারি চালাবে এবং সকল দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator