প্যারিস অলিম্পিক ২০২৪: বাংলাদেশের পদক স্বপ্ন, না কি অংশগ্রহণের আভিজাত্য? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্যারিস অলিম্পিক ২০২৪: বাংলাদেশের পদক স্বপ্ন, না কি অংশগ্রহণের আভিজাত্য?

রায়হান রশীদ  avatar   
রায়হান রশীদ
প্যারিস অলিম্পিক ২০২৪: বাংলাদেশের পদক স্বপ্ন, না কি অংশগ্রহণের আভিজাত্য?
প্যারিস অলিম্পিক ২০২৪: বাংলাদেশের পদক স্বপ্ন, না কি অংশগ্রহণের আভিজাত্য?
ছবি: সংগৃহীত
প্যারিস অলিম্পিক ২০২৪-এর প্রাক্কালে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) কর্তৃক ঘোষিত আট সদস্যের দল এবং তাদের অংশগ্রহণের ধরন দেশের ক্রীড়া মহলে নতুন করে আলো...

প্যারিস অলিম্পিক ২০২৪-এর প্রাক্কালে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) কর্তৃক ঘোষিত আট সদস্যের দল এবং তাদের অংশগ্রহণের ধরন দেশের ক্রীড়া মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরাসরি কোয়ালিফাইং মার্ক অর্জন করে কোনো অ্যাথলেটের স্থান না পাওয়া এবং ওয়াইল্ড কার্ড বা ইউনিভার্সালিটি কোটার ওপর নির্ভরশীলতা, বাংলাদেশের ক্রীড়া কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জগুলোকেই সামনে নিয়ে আসে। এর আগেও লন্ডন ২০১২, রিও ২০১৬ বা টোকিও ২০২০ অলিম্পিক গেমসেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মূলত ওয়াইল্ড কার্ডের মাধ্যমেই হয়েছিল, যা বৈশ্বিক ক্রীড়া মঞ্চে দেশের প্রকৃত অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই প্রেক্ষাপটে, প্যারিসে পদক স্বপ্ন দেখা যতটা না বাস্তবতা, তার চেয়ে বেশি মনে হয় অংশগ্রহণের আভিজাত্য রক্ষা করা।

বাংলাদেশের ক্রীড়া উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা সত্ত্বেও, অলিম্পিকের মতো সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিযোগিতায় পদক জেতার মতো সক্ষমতা অর্জনে আমরা এখনও বহু পিছিয়ে। বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) এবং বিভিন্ন ফেডারেশনের মাধ্যমে ক্রীড়া খাতে উল্লেখযোগ্য বাজেট বরাদ্দ করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও ক্রীড়া উপকরণ ক্রয়ে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। এতদসত্ত্বেও, তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান অ্যাথলেট খুঁজে বের করা এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনার প্রক্রিয়াটি এখনও দুর্বল। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো যদিও সরাসরি অলিম্পিক ক্রীড়া উন্নয়নে বড় আকারের প্রকল্প অর্থায়ন করে না, তবে যুব উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে তাদের বিনিয়োগ পরোক্ষভাবে ক্রীড়া বিকাশে সহায়ক হতে পারতো, যা এক্ষেত্রে সেভাবে কাজে লাগানো যায়নি। অনেক সময় দেখা যায়, অবকাঠামোগত উন্নয়নে অর্থ ব্যয় হলেও প্রশিক্ষক, পুষ্টিবিদ, মনোবিজ্ঞানী ও আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের সমন্বিত দলের অভাব প্রকট। এই ঘাটতিগুলো দেশের অ্যাথলেটদের আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানোর পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে, যেখানে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোও অলিম্পিক পদক জয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে।

বাংলাদেশের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর স্বায়ত্তশাসন এবং জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অধিকাংশ ফেডারেশন নিজস্ব ক্রীড়া ক্যালেন্ডার তৈরি, প্রতিভাবান খেলোয়াড় নির্বাচন এবং তাদের সঠিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের অভাব প্রদর্শন করে। উদাহরণস্বরূপ, সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স, শ্যুটিং বা আর্চারির মতো ইভেন্টগুলো যেখানে তুলনামূলকভাবে কম খরচে প্রশিক্ষিত খেলোয়াড় তৈরি করা সম্ভব, সেখানেও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। বিদেশি প্রশিক্ষক নিয়োগ, উন্নত প্রশিক্ষণ শিবির আয়োজন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত। বাংলাদেশ সরকার যদিও ক্রীড়া খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে, কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর মনিটরিং ও ইভালুয়েশন সিস্টেমের অভাব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ক্রীড়া নীতিমালায় খেলোয়াড়দের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন অত্যন্ত ধীর গতিতে চলছে। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক ক্রীড়া উন্নয়নে রোডম্যাপ তৈরি করা হলেও, তা প্রায়শই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সমন্বয়হীনতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে, প্যারিস অলিম্পিক ২০২৪-এ অংশগ্রহণ একপ্রকার আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে, যেখানে পদক জয়ের স্বপ্ন কেবলই একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে যাচ্ছে, যা বাস্তবতার নিরীখে এখনো বহু দূরে।

অলিম্পিক আসর মোট অংশগ্রহণকারী অ্যাথলেট ওয়াইল্ড কার্ড প্রাপ্ত অ্যাথলেট সরাসরি কোয়ালিফাই করা অ্যাথলেট প্রাপ্ত পদক (স্বর্ণ/রৌপ্য/ব্রোঞ্জ)
লন্ডন ২০১২ ৫ জন ৫ জন ০ জন ০/০/০
রিও ২০১৬ ৭ জন ৭ জন ০ জন ০/০/০
টোকিও ২০২০ ৬ জন ৬ জন ০ জন ০/০/০
প্যারিস ২০২৪ (প্রাক্কলিত) ৮ জন ৮ জন ০ জন ০/০/০

উৎস: বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) এবং আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি)

সুপারিশ

  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি ২০২৪' (প্রস্তাবিত) এর আওতায় একটি সুনির্দিষ্ট 'অলিম্পিক টার্গেট প্রোগ্রাম' প্রণয়ন করা। এই প্রোগ্রামের অধীনে ২০৩২ সালের অলিম্পিককে লক্ষ্য করে অন্তত ৫টি সম্ভাবনাময় ডিসিপ্লিন (যেমন: আর্চারি, শ্যুটিং, সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স, টেবিল টেনিস) নির্বাচন করে বিদেশি প্রশিক্ষক, স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট এবং পুষ্টিবিদদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের একটি দল দ্বারা দীর্ঘমেয়াদী ও বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক 'ক্রীড়া বাজেট বরাদ্দ আইন' (প্রস্তাবিত) এর মাধ্যমে ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন: ২৫%) তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান অ্যাথলেট খুঁজে বের করা এবং তাদের আবাসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (যেমন: বিকেএসপি বা অনুরূপ আঞ্চলিক কেন্দ্র) ভর্তির জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে। World Bank এবং ADB এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে 'যুব ও ক্রীড়া উন্নয়ন তহবিল' গঠন করে এই কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো যেতে পারে।
  • বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) এবং প্রতিটি ক্রীড়া ফেডারেশনকে 'ক্রীড়া ফেডারেশন জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নীতিমালা' (প্রস্তাবিত) এর অধীনে তাদের বার্ষিক কার্যক্রম, বাজেট ব্যবহার এবং খেলোয়াড় নির্বাচনের প্রক্রিয়া জনসম্মুখে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এছাড়াও, আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) এর 'গুড গভার্নেন্স' নীতির সাথে সঙ্গতি রেখে একটি স্বাধীন অডিট কমিটি গঠন করে ফেডারেশনগুলোর কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রায়হান রশীদ

রায়হান রশীদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator