আবাসন খাতে দুর্নীতির জাল: ডিজিটাল যুগেও ভূমি অফিসে ঘুষের মচ্ছব | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আবাসন খাতে দুর্নীতির জাল: ডিজিটাল যুগেও ভূমি অফিসে ঘুষের মচ্ছব

নাঈমুর রহমান  avatar   
নাঈমুর রহমান
আবাসন খাতে দুর্নীতির জাল: ডিজিটাল যুগেও ভূমি অফিসে ঘুষের মচ্ছব
আবাসন খাতে দুর্নীতির জাল: ডিজিটাল যুগেও ভূমি অফিসে ঘুষের মচ্ছব
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের আবাসন খাত, বিশেষ করে ভূমি ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘকাল ধরেই দুর্নীতি ও অনিয়মের এক জটিল জালে আবদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ডিজিটাল ভূমি সেবা চালু করে এই ...

বাংলাদেশের আবাসন খাত, বিশেষ করে ভূমি ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘকাল ধরেই দুর্নীতি ও অনিয়মের এক জটিল জালে আবদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ডিজিটাল ভূমি সেবা চালু করে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের চেষ্টা করলেও, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের তথ্য বলছে, দুর্নীতির লাগাম টানা এখনও কঠিন। তৃণমূল থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত এই খাতে ঘুষ, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা নিয়মিতই উঠে আসছে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে এবং সরকারের রাজস্ব হারাচ্ছে।

ভূমি সংক্রান্ত কার্যক্রমে দুর্নীতি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। ভূমি অফিসগুলো যেন 'ঘুষের হাট'-এ পরিণত হয়েছে, যেখানে সরকারি ফির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ দাবি করা হয়। ২০২৩ সালের টিআইবি'র 'সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ' অনুযায়ী, ভূমি সেবা গ্রহণকারী পরিবারগুলোর ৬৬.২ শতাংশই কোনো না কোনো দুর্নীতির শিকার হয়েছে, যা ২০২২ সালের ৫১ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই জরিপ আরও দেখায় যে, ভূমি সেবায় খানা প্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ছিল ১১,৭৭৬ টাকা, এবং এই খাতে ঘুষের মাধ্যমে দেশব্যাপী প্রায় ৩,০৮১ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে, যা জরিপে অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য সেবা খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ। সাতক্ষীরার তালার ইসলামকাটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েব আব্দুল মুকিতের বিরুদ্ধে নামজারির জন্য সরকার নির্ধারিত ১,১৫০ টাকার পরিবর্তে ৬,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি অশিক্ষিত ব্যক্তিদের ভুল বুঝিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। এছাড়া, ভুল রেকর্ড সংশোধন, মাঠ পরচা পেতে দীর্ঘসূত্রিতা, ডিজিটাল ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধে অবৈধ অর্থ আদায় এবং দালালদের দৌরাত্ম্য ভূমি অফিসের নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র।

শুধু ভূমি অফিস নয়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-ও দুর্নীতির সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে। টিআইবি'র গবেষণায় দেখা গেছে, নকশা অনুমোদনে ব্যক্তি পর্যায়ে ৫০ হাজার থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা এবং রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে ২ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এমনকি ১০ তলার বেশি ইমারতের নকশা অনুমোদনে ১৫ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ঘুষের অভিযোগ রয়েছে। প্লট বরাদ্দ, নামজারি, হেবা ফ্ল্যাট ও বিক্রয় অনুমোদনেও বিপুল অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়। রাজউকের উচ্চমান সহকারী, নিম্নমান সহকারী, বেঞ্চ সহকারীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাজউকের ১৪ জন কোটিপতি কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে, যাদের স্বল্প বেতনের চাকরি করেও কোটি কোটি টাকার বাড়ি, গাড়ি, প্লট ও দোকানের মালিকানা রয়েছে। এমনকি পূর্বাচল কনভেনশন লিমিটেডের প্লট বরাদ্দে ৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুদক, যেখানে রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম উঠে এসেছে। উচ্চ পর্যায়ের প্লট দুর্নীতির মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ২১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হয়েছে, যা এই খাতের দুর্নীতির গভীরতা প্রমাণ করে।

ভূমি জালিয়াতি ও প্রতারণা এই খাতের আরেকটি বড় সমস্যা। অবৈধ দখল, জাল দলিল তৈরি এবং প্রতারণামূলকভাবে জমি নিজের নামে লিখে নেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় সরকার 'ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩' প্রণয়ন করেছে, যেখানে ভূমি জালিয়াতির জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে, আইনের প্রয়োগ সত্ত্বেও জালিয়াতির ঘটনা থেমে নেই। বরিশালের আগৈলঝাড়ায় জাল দলিলের মাধ্যমে ২৭ শতাংশ জমি নামজারি করে বিক্রির ঘটনায় সিআইডি তদন্ত করছে। ফেনী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এক দলিল লেখক ও তার ছেলের বিরুদ্ধে ২৬টি জাল দলিল তৈরি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন এবং বিপুল রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে, যার তদন্ত চলছে। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি জালিয়াতি, মেয়েদের বাদ দিয়ে সম্পত্তি বন্টন, সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানাধীন দেখানো, মূল দলিল ঘষামাজা করা বা সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর জাল করার মতো বিভিন্ন উপায়ে জাল দলিল তৈরি হচ্ছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে নয়। দুদক এই মন্ত্রণালয়ের ১০টি খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করেছে। তবে, মন্ত্রণালয় গত এক বছরে ৯২ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ভবন নির্মাণ অনুমোদনের ধাপ ও সময় কমিয়ে এনেছে।

সুপারিশ: আবাসন খাত ও রিয়েল এস্টেট ক্রাইম দমনে একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ অপরিহার্য। প্রথমত, ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে এবং ডিজিটাল সেবার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষের সরাসরি সংস্পর্শ কমানো যায়। দ্বিতীয়ত, 'ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩'-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং জালিয়াতির ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। তৃতীয়ত, রাজউকসহ অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অডিট ও নজরদারি বাড়াতে হবে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখতে হবে। চতুর্থত, ভূমি সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ১৬১২২ হটলাইন এবং অন্যান্য অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও প্রচার বাড়াতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে অভিযোগ করতে পারে। পরিশেষে, ভূমি ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব বৃদ্ধিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


🔎 অনুসন্ধানে: নাঈমুর রহমান

নাঈমুর রহমান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: আবাসন খাত ও রিয়েল এস্টেট ক্রাইম।

没有找到评论


News Card Generator